শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬,
৭ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু      রাষ্ট্রপতির শপথ-দায়িত্বভার গ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি      নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা      রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ মির্জা ফখরুলের      প্রতিমন্ত্রী থেকে পূর্ণমন্ত্রী হলেন রশিদুজ্জামান মিল্লাত      কে কোন দায়িত্ব পাচ্ছেন শপথ নেওয়া ছয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী      
ফিচার
পরাজয়ের নেপথ্য কাহিনী
নিয়াজির ভাষ্যে ১৯৭১, আত্মসমর্পণ ও বিশ্বাসঘাতকতা
খোলা কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:২৬ পিএম

নিয়াজি জোর দিয়েই বলেছেন, ভারতের আক্রমণ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানকে বাঁচাতে পূর্ব পাকিস্তানকে বলি দেয়া হয়েছে। পাকিস্তান যখন অস্তিত্বের সংকটে, তখন জ্যেষ্ঠতম ক্ষমতাসীনদের একজন নারীসঙ্গ করছেন, একজন স্কোয়াশ খেলছেন, একজন ফুরফুরে মেজাজে ছুটি কাটাচ্ছেন।

পরাজিতের ভাষ্য না শুনলে বিজয়ীর কাহিনী অসম্পূর্ণ ও একপেশে রয়ে যায়। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ঢাকা রেসকোর্সে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে (জ্যাকব বলেছেন প্রকৃতপক্ষে ৪টা ৫৫ মিনিট) পাকিস্তান  ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির আত্মসমর্পণ দলিলে সই করার মাধ্যমে পাকিস্তানের  'অপরাজেয়' সৈন্যবাহিনী ধূলিচুম্বন করে। নিয়াজি প্রকাশ্যে আত্মসমর্পণ করতে চাননি, কিন্তু তাকে রেসকোর্সের মতো খোলা ময়দানে জনতার সামনে আত্মসমর্পণ করতে আসতে হয়; তিনি ভারতীয় ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে নয়, কেবল ভারতীয় কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছেন, সে আবেদনও মঞ্জুর হয়নি।

হামুদুর রহমান কমিশন পরাজয়ের দায় অনেকটাই নিয়াজির উপর  চাপিয়েছে। কমিশনের সম্পূরক প্রতিবেদনে নিয়াজির অনেক স্খলনের কথা উঠে এসেছে। শিয়ালকোট ও লাহোরে জিওসি ও সামরিক শাসক হিসেবে কাজ করার সময় সামরিক আইনের আওতায় আনীত মামলায় ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে অনেক টাকাকড়ি করেছেন। সেনোরিটা হোম নামের কার্যত একটি পতিতালয়ের কর্ত্রী সাইদা বুখারির সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক ছিল, তার মাধ্যমে তিনি ঘুষের টাকা গ্রহণ করতেন। আরো অনেক অভিযোগের একটি তিনি ইস্টার্ন কমান্ড প্রধানের দায়িত্বরত অবস্থায় ঢাকা থেকে পানের ব্যবসা করতেন।

নিয়াজির ভাষ্যটি জানাও প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, ১৯৭১ সংকট সৃষ্টির প্রধান  ষড়যন্ত্রকারী জুলফিকার আলী ভুট্টো। ইয়াহিয়াও ক্ষমতা ছাড়তে চাননি। লারকানা ষড়যন্ত্র ও এমএম আহমদ  প্ল্যানের বাস্তবায়ন ঘটেছে পাকিস্তানের  খন্ডীকরণের মাধ্যমে।

তিনি মনে করেন তার ঘরের ভেতর বিভীষণ ছিলেন মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী খান। আত্মসমর্পণসহ বহু ঘটনা তাকে অন্ধকারে রেখে ফরমানই ঘটিয়েছেন। ফরমানের সঙ্গে রুশ কনসাল জেনারেল ও ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের যোগাযোগ ছিল। এককভাবে বাঁচতে চাইলে তিনি ইচ্ছে করলেই হেলিকপ্টার নিয়ে অন্য দেশে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে পারতেন। আর রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণের ঘটনা হামেশাই ঘটে থাকে।

উত্তর দিক থেকে সামরিক সাহায্য নিয়ে চীন আসছে এবং দক্ষিণ দিক থেকে আসছে আমেরিকা এ রকম বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যে সিগনাল দিয়ে প্রেসিডেন্ট  ও সেনাপ্রধান  উভয়ই ইস্টার্ন কমান্ডের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তিনি মনে করেন ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের মেজর জেনারেল জ্যাকবও সৈনিকদের মুক্তিবাহিনীর হাতে তুলে দেয়ার হুমকি দিয়ে তাকে ব্লাকমেইল করেছেন।
 
পাকিস্তান ভাঙনের পর বহু জেনারেল চাকরিচ্যুত হলেও 'ঢাকার কসাই' কুখ্যাত টিক্কা খান পদোন্নতি পেয়েছেন। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান হয়েছেন। 

নিয়াজি জোর দিয়েই বলেছেন, ভারতের আক্রমণ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানকে বাঁচাতে পূর্ব পাকিস্তানকে বলি দেয়া হয়েছে। পাকিস্তান যখন অস্তিত্বের সংকটে, তখন জ্যেষ্ঠতম ক্ষমতাসীনদের একজন নারীসঙ্গ করছেন, একজন স্কোয়াশ খেলছেন, একজন ফুরফুরে মেজাজে ছুটি কাটাচ্ছেন।

২২ নভেম্বর ১৯৭১ থেকে ২ ডিসেম্বর ১৯৭১

ঘাটতি পূরণ করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে কোনো উদ্যোগই নেই; কূটনৈতিক, রাজনৈতিক উদ্যোগও না। ভুট্টো লাহোর এয়ারপোর্টে বিবৃতি দিয়েছেন, 'ভারতীয় আগ্রাসনের বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে নিয়ে যাওয়া পাকিস্তানের সমীচীন হবে না।' এটাই সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ, যেখানে ভিকটিম তার আক্রান্ত হওয়ার প্রতিকারের দাবি নিরাপত্তা পরিষদে তুলছে না। 

৩ ডিসেম্বর 

ইস্টার্ন কমান্ডকে কোনোভাবে অবহিত না করে পাকিস্তান  অতর্কিতে স্থল আক্রমণের বদলে ভারতে বিমান আক্রমণ শুরু করে দেয়।

৪ ডিসেম্বর 

নিরাপত্তা পরিষদে পোল্যান্ডের প্রস্তাবে অস্ত্রবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলা হয়, তবে পাকিস্তান  তা প্রত্যাখ্যান করে।

৫ ডিসেম্বর 

সেনা সদর দপ্তর থেকে হুকুম দেয়া যেন আমরা ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের সৈন্যদের এখানেই ব্যস্ত থাকতে বাধ্য করি, যাতে তাদের পশ্চিম  পাকিস্তানের  বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানো না যায়। 

কাজেই আমাকে পর্যাপ্তসংখ্যক সৈন্য দিনাজপুর, রংপুর, খুলনাসহ বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধবিরতির পূর্ব পর্যন্ত ভারতীয়দের ব্যস্ত রাখার জন্য অবস্থান করাতে হচ্ছে যা রাজশাহী সেক্টরে আমার আক্রমণ পরিকল্পনাকে ব্যাহত করে। সেনা সদর দপ্তর থেকে আমাকে জানানো হয় যে আমরা শিগগিরই চীনের সাহায্য পেতে যাচ্ছি। 

এটা ছিল একটা প্রহসন, আমাদের ভুল পথে পরিচালিত করার একটি চিত্র; বাস্তবে এর কিছুই ঘটেনি।

৬ ডিসেম্বর 

ভারতের বিরুদ্ধে এয়ার মার্শাল রহিম পাকিস্তান বিমান বাহিনীকে কাজে লাগালেন না, জেনারেল টিক্কা খান পরিকল্পনা অনুযায়ী আক্রমণ চালালেন না এবং ভারতীয় নৌবাহিনী যখন আমাদের নৌদুর্গ করাচি আক্রমণ করল, আমাদের নৌবাহিনী কোনো ধরনের প্রতিরোধ গড়ে তুলল না। 

৭ ডিসেম্বর 

গভর্নর হাউজ (ঢাকা) থেকে একটি আতঙ্কজনক সিগনাল প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হলো: পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড ভেঙে পড়ার পথে। কিন্তু সত্য হচ্ছে যশোর থেকে প্রত্যাহারের পর ব্রিগেডিয়ার হায়াত ও ব্রিগেডিয়ার মঞ্জুর দুই ডিভিশন শত্রুসৈন্য খুলনা ও কুষ্টিয়ায় টেনে এনেছেন। শত্রুর দুটি কোর লক্ষ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা হারিয়েছে। যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত সিলেট, ভৈরববাজার, ময়নামতি, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, চালনা, খুলনা, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী সবই আমাদের অধিকারে ছিল।

হিলিতে তীব্র লড়াই হয়েছে, পশ্চিম  সীমান্তেও লড়াই চলছিল। এটা স্পষ্ট, গভর্নর হাউজ থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফরমানের (রাও ফরমান আলী) করা খসড়া অনুযায়ী পাঠানো সিগনাল বার্তায় বলা হয়েছে, ইস্টার্ন কমান্ড ধসে যাচ্ছে। বাস্তবে বিষয়টি ছিল ঠিক উল্টো। আমরা কিন্তু পূর্ব পাকিস্তান  ধরে রেখেছি এবং পশ্চিম  গ্যারিসন ধসে পড়েছে বা পড়তে যাচ্ছে। 

ভারতীয় বাহিনী সেখানে আমাদের জমিনে, আমাদের আকাশে ও আমাদের সমুদ্রে যথেচ্ছ বিচরণ করছে। সেনা সদর দপ্তর ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের কাছে যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, আমাকে তার কিছুই জানানো হয়নি।

৮ ডিসেম্বর 

সেনা সদর দপ্তরের একটি প্রহসনমূলক সিগনাল আমার কাছে এসেছে। তাতে বলা হয়েছে, চীন তার কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। যুদ্ধের মতো একটি বিষয়ে এর চেয়ে বড় ধরনের কোনো ঠান্ডা মাথার প্রহসন কল্পনা করা যায় না। পশ্চিম  পাকিস্তানের আক্রমণ ব্যর্থ হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ৮ ডিসেম্বর ভুট্টোকে জাতিসংঘে পাঠালেন, যুদ্ধের ১৮তম দিনে। 

ভুট্টো নিউ ইয়র্ক পৌছতেই তিনদিন লাগিয়ে দেন। তারপর  অসুস্থতার ভান করে পড়ে থাকেন (কোনো ডাক্তার তাকে দেখতে যাননি, এমনকি বেনজিরও না; তিনিও একই হোটেলে অবস্থান করছিলেন)।

৯ ডিসেম্বর

ফরমান আলী খান প্রস্তাব করলেন, ঢাকাকে মুক্ত ও নিরাপদ শহর ঘোষণা করা হোক। নিজেকে বাঁচিয়ে ইস্টার্ন কমান্ডের উপর দোষারোপ করার এ আরেকটি পাঁয়তারা। আমার সৈনিকরা ঢাকার ভেতরে ও বাইরে পরিত্যক্ত হয়ে থাকবে, অনাকাঙ্খিত শক্তির ঢাকায় প্রবেশের এ এক অবারিত আমন্ত্রণ, আমি একটি গুলিও করতে পারব না। সৈনিকদের মনোবল ভেঙে দেয়ার এবং পূর্ব পাকিস্তান  আর প্রতিরক্ষার উপযোগী নেই, মানুষকে এ কথা বোঝানোর এটি একটি সুপরিকল্পিত আয়োজন।

ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাবসংবলিত আরেকটি সিগনাল গভর্নর হাউজ থেকে প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হয়। আমি তাতে সম্মত নই। আমি গভর্নরের মাধ্যমে সেই সিগনালেই জানাই যে আমি শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু প্রেসিডেন্ট  আমাকে গভর্নরের নির্দেশ মেনে নেয়ার আদেশ দেন। 

রাজনৈতিক কার্যক্রমসহ সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তিনি গভর্নরকে অর্পণ করেন। রাজনৈতিক বিষয় তার আয়ত্তের বাইরে। কারণ মুজিব তখন পশ্চিম  পাকিস্তানে।

১০ ডিসেম্বর 

জাতিসংঘের প্রতিনিধির কাছে যুদ্ধবিরতি, ক্ষমতা হস্তান্তর, পশ্চিম  পাকিস্তানি  সৈনিকদের পশ্চিম  পাকিস্তানে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত একটি নোট হস্তান্তরের জন্য গভর্নর মালিক প্রেসিডেন্টের অনুমোদন চান। 

প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের তোয়াক্কা না করে ফরমান অত্যন্ত গোপনীয় এ বার্তা জাতিসংঘ প্রতিনিধির হাতে তুলে দেন, আর নেই প্রতিনিধি বিষয়টি জাতিসংঘকে জানান। ফরমান ফ্রান্স, ব্রিটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের দায়িত্ব গ্রহণের কথা বলেন। চীনের প্রতিনিধিকেও তাদের সঙ্গে যোগ দিতে বলেন। 

আমাকে কিংবা গভর্নরকে না জানিয়েই ফরমান ভারতীয় কমান্ডার ইন চিফের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন। জাতিসংঘের জন্য বর্ণিত সিগনালটি আমাকে কিংবা গভর্নরকে না জানিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। এমনকি রুশ কনসাল জেনারেলের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি নিয়েও আমাদের দুজনের কেউই অবহিত ছিলাম না।

১১ ডিসেম্বর 

সেনাবাহিনী প্রধান আমাকে গভর্নরের আদেশ মেনে নেয়ার নির্দেশ দেন। অন্যভাবে বলা যায়, আমাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। আত্মসমর্পণের প্রশ্ন উঠলে সৈন্যদের নিরাপত্তার কথা উঠবে, অস্ত্রশস্ত্র ধ্বংস করার কথা উঠবে। 

জাতিসংঘকে পাঠানো গতদিনের নোটের উপর ভিত্তি করে বেশ সকালেই রুশ কনসাল জেনারেল এটিতে সম্মত হওয়ার কথা ফরমানকে জানান। ফরমান গভর্নরও নন, ট্রুপসের কমান্ডারও নন। তারা তাকে কনস্যুলেটে আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদান এবং পশ্চিম পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।

১২ ডিসেম্বর 

লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান আরেকটি ভুয়া চিত্র আমার সামনে তুলে ধরেন। তিনি পশতু ভাষায় আমাকে বলেন, 'উত্তর থেকে হলুদ এবং দক্ষিণ থেকে সাদা' আসছে। আমাকে পূর্ব পাকিস্তান  আর ৩৬ ঘণ্টা ধরে রাখার জন্য বলা হয়, কারণ উত্তর দিক থেকে চীন এবং দক্ষিণ দিক থেকে আমেরিকা আসছে। এ এক ডাহা মিথ্যে। 

আমি কখনো তাদের বলিনি যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, প্রকৃতপক্ষে আমার প্রতিটি সিগনাল বার্তায় শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথা বলেছি। আমার উপর  দায় ফেলে দেয়ার এ আরেক চতুরতা।

পরে টেলিফোনে আমি গুল হাসানকে জানাই, দয়া করে আর মিথ্যে বলবেন না, আমি সাহায্যও চাইনি, তার প্রয়োজনও নেই। আমি আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছি, পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধটার দিকে নজর দিন, সে যুদ্ধটা জেতা দরকার। আমারটা আমি বুঝব।

এর পর থেকে তিনি আমার সঙ্গে কথা বলা এড়িয়ে যান। পরিকল্পনা অনুযায়ী মেজর জেনারেল কাজী মজিদকেও ঢাকায়  শেষ অবলম্বন হিসেবে রাখা হয়নি।

১৩ ডিসেম্বর 

আমি সেনা সদর দপ্তরে সিগনাল পাঠাই: ঢাকা প্রতিরক্ষা ব্যুহ সুগঠিত, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করে ঢাকা প্রতিরক্ষা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমি একটি প্রেস বার্তাও পাঠাই। তাতে বলা হয়, আমার মৃতদেহের উপর  দিয়ে ট্যাংক যাবে।

সে রাতে আমি আরো একটি সিগনাল পাঠাই: 'চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছি।' আর শেষ সৈন্যটি জীবিত থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আদেশ জারি করি। ওদিকে সরকার কিংবা আমার সঙ্গে কোনো রকম সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই ফরমান প্রস্তাব করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালকে আন্তর্জাতিক নিরাপদ এলাকা (ইন্টারন্যাশনাল সেফ জোন) ঘোষণা করা হোক।

১৩/১৪ ডিসেম্বর 

আত্মসমর্পণ করার জন্য প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে একটি খোলা, অশ্রেণীবিন্যস্ত (আনক্ল্যাসিফায়েড) সিগনাল আসে। আমি তাদের বলি, 'আমার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এখনো বহাল আছে।' গভর্নরের পক্ষে ফরমান যে সিগনাল পাঠিয়েছে, প্রেসিডেন্টের সিগনাল তারই জবাব। অথচ ফরমানের পাঠানো সিগনাল সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। 

সেনাবাহিনীর প্রধান  কিংবা পীরজাদা কাউকে পাওয়া গেল না। গুল হাসান এ সম্পর্কে কিছু না জানার ভান করলেন, যদিও তিনি চিফ অব জেনারেল স্টাফ এবং মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স ও সিগনাল ডিরেক্টরেটের প্রধান।

গভর্নর মালিক ও তার মন্ত্রিপরিষদ পদত্যাগ করলে আমি নিঃসঙ্গ হয়ে যাই এবং চাপের মুখে পড়ি। কারণ আমি আত্মমর্পণে অনিচ্ছুক ছিলাম। একই সঙ্গে গভর্নরও আত্মসমর্পণ দলিল সই করা এড়িয়ে যেতে চাইলেন।

১৫ ডিসেম্বর 

রাশিয়ার সমর্থনে পোল্যান্ড জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করে, যাতে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার এবং প্রাথমিকভাবে ৭২ ঘণ্টা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেয়া হয়। 

সেনাপ্রধান জেনারেল হামিদের একান্ত সচিব ব্রিগেডিয়ার জানজুয়া আমার চিফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার মালিককে বর্ণিত সিগনালটি পাঠানো হচ্ছে বলে জানান। আমি সেনা সদর দপ্তরে আবার সিগনাল পাঠিয়ে জানিয়ে দিই, 'শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করার আমার সিদ্ধান্ত বহাল আছে।'

জেনারেল হামিদ ও এয়ার চিফ মার্শাল রহিম ফোন করে ১৪ ডিসেম্বরের সেনা সদর দপ্তরের সিগনাল মান্য করার নির্দেশ দিলেন, কারণ পশ্চিম পাকিস্তান বিপজ্জনক অবস্থায়। ভারতের কমান্ডার ইন চিফের কাছে রুশদের মাধ্যমে, আমেরিকানদের নয়, বার্তা পাঠাতে ফরমান পীড়াপীড়ি করেন। আমি যুদ্ধবিরতি এবং সৈন্য ও অনুগত পাকিস্তানিদের নিরাপত্তা চেয়ে বার্তা পাঠাই।

১৬ ডিসেম্বর 

আমাদের ট্রুপস আত্মসমর্পণ করবে এ শর্তে ভারতের কমান্ডার ইন চিফ (জেনারেল মানেকশ) সম্মত হন। আমি তার জবাব সেনাপ্রধানকে জানাই, তিনি তা গ্রহণ করার এবং আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেন।

শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়ার জন্য এবং সেনাবাহিনীর সম্মান রক্ষা করার জন্য আমি প্রেসিডেন্টকে একটি সিগনাল পাঠাই। তিনি আমার সিগনালের উপর  লিখেন: এনএফএ (নো ফারদার অ্যাকশন), আর কিছু করার নেই।

আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে চাই, কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। সেনাপ্রধান  কোথায় আছেন, তাও বের করা যাচ্ছে না। জেনারেল পীরজাদা বেলা আড়াইটাই স্কোয়াশ খেলতে গেছেন এবং আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবেন না।

পোলিশ প্রস্তাব গ্রহণ করার বদলে ইস্টার্ন কমান্ডের উপর  চাপিয়ে দেয়া হলো অসম্মানজনক আত্মসমর্পণ। এভাবেই নিশ্চিত করা হলো পূর্ব পাকিস্তান  কোনো উত্তরাধিকারী সরকার ছাড়াই থাকবে।
 
সেনাপ্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ খান

১৬ ডিসেম্বরের পরে

এ অবমাননাকর পরিস্থিতির জন্য জাতি ক্ষিপ্ত এবং এর তিক্ত প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। জেনারেল হামিদ যখন সেনা সদর দপ্তরে অফিসারদের উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছিলেন, ব্রিগেডিয়ার ফজলে রাজিক খানের নেতৃত্বে তাকে লক্ষ্য করে গালাগাল করা হয়। ফজলে রাজিক গুল হাসানের ঘনিষ্ঠ সহচর। 

এয়ার মার্শাল রহিম ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট হাউজের উপর উড়োজাহাজ চালিয়ে (বোমাবর্ষণের ভয় দেখিয়ে) ইয়াহিয়াকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার প্রচেষ্টা চালান।

এখানে জুলফিকার আলী ভুট্টো, এয়ার মার্শাল রহিম ও গুল হাসানের পরিকল্পিত অভ্যুত্থান স্পষ্ট। ভুট্টো প্রায় সব জেনারেল ও অনেক ব্রিগেডিয়ারকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করলেন, কিন্তু রেখে দিলেন জেনারেল টিক্কা খানকে। 

দাপ্তরিক কাজে টিক্কা খানকে সাহায্য করার জন্য মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলীকেও রেখে দিলেন। ইস্টার্ন কমান্ড ও আমার উপর  সম্পূর্ণ দোষ চাপিয়ে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় সেনাবিরোধী প্রচারণা চলতে থাকে। আমার কমান্ডের পক্ষে বলার জন্য কিংবা ভুট্টোর ষড়যন্ত্র এবং গুল হাসান ও টিক্কা খানের অপকর্ম তুলে ধরার জন্য সেখানে তো আমি ছিলাম না।

কেকে/ আরআই


আরও সংবাদ   বিষয়:  নিয়াজি   ১৯৭১   আত্মসমর্পণ   বিশ্বাসঘাতকতা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

ফিচার- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close