মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশে লোডশেডিং একটু একটু করে বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়েছে আরও আগে থেকেই। তবে গত তিন দিনে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে বলেই তথ্য মিলছে।
মূলত গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে চাহিদা বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি থাকায় গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং দিতে হয়েছে। এমনকি রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন অন্তত ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
যদিও দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিট চালু এবং আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক হলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট আমাদের যা সাপ্লাই করত, তাদের একটি ইউনিটে সমস্যা হওয়ায় এখন অর্ধেক দিতে পারছে। বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাদের সবার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। আশা করছি, সপ্তাহখানেকের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে তীব্র লোডশেডিংয়ের বিরূপ প্রভাব পড়েছে যশোর জেলার কৃষিকাজে। বিভিন্ন জেলায় অনেক ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। কৃষকেরা তেল পাচ্ছেন না, বিদ্যুৎও ভোগাচ্ছে।
বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৬৪৭ মেগাওয়াট; যার বিপরীতে ওই দিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৪৬৭ মেগাওয়াট। গত বৃহস্পতিবার তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি লোডশেডিংয়ের তথ্য জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির অঞ্চলভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জোনে সবচেয়ে বেশি—ছয় হাজার ১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে।
খুলনা জোনে এক হাজার ৯৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৮০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে এক হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৫০ মেগাওয়াট, রাজশাহী জোনে এক হাজার ৮০৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৮০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কুমিল্লা জোনে এক হাজার ৫৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২২০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে এক হাজার ৭০ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১৮০ মেগাওয়াট, সিলেটে ৫৭৬ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১০০ মেগাওয়াট, বরিশালে ৪৬৮ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৬০ মেগাওয়াট এবং রংপুরে এক হাজার দুই মেগাওয়াটের বিপরীতে ১৬৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে ধাপে ধাপে লোডশেডিং বেড়েছে। গরমের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং একাধিক পাওয়ার প্ল্যান্টের ইউনিটে কারিগরি জটিলতা তৈরি হওয়ায় সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো মূলত গ্যাস ও কয়লানির্ভর হওয়ায় জ্বালানি সংকটে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের মতো। এ ছাড়া আদানির একটি বিদ্যুৎ ইউনিটে কারিগরি সমস্যা তৈরি হওয়ায় সব মিলিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জ্বালানির চিন্তা না করে কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ; যার ফলে যখনই জ্বালানির ঘাটতি হয়েছে, তখনই বিদ্যুৎ নিয়ে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘আপনার গাড়ি আছে, কিন্তু গাড়ি চালানোর তেল নেই—বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সেক্টরের বর্তমান অবস্থা ঠিক এমন।’
পরিস্থিতি পুরো ঠিক না হলেও খুব শিগগির সহনীয় পর্যায়ে আসবে বলেই মনে করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। তারা বলছে, আগামী সপ্তাহ থেকে আদানি পাওয়ারের আমদানিকৃত বিদ্যুৎ আবারও পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের আইপিপি প্ল্যান্ট থেকে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ এক সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক হতে পারে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকলে এবং বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের এই প্রেক্ষাপট ঠিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং সহ্য করেই চলতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলছেন, প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মেগাওয়াটের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল করে এই মুহূর্তে লোডশেডিং কমানো সম্ভব। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম যত বাড়বে, সেটি বহন করা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কঠিন।
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে এই খাতে। এবার হয়তো সেটা ৬০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। ফার্নেস অয়েলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে চাইলেই বাড়তি উৎপাদন করা যাবে না।’
কেকে/এলএ