সব জল্পনা-কল্পনা, কুসংস্কার আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা ‘তান্ত্রিক-মান্ত্রিক’ আলোচনাকে উড়িয়ে দিয়ে দারুণ জয় তুলে নিয়েছে আর্জেন্টিনা। দলের এই জয়কে ঘিরে কিশোরগঞ্জজুড়ে নেমে আসে উৎসবের আমেজ। রাতের বৃষ্টিকেও উপেক্ষা করে হাজারো সমর্থক রাস্তায় নেমে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন। আতশবাজির ঝলক, নাচ, আর বিজয়ের স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে জেলার বিভিন্ন এলাকা।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) রাত থেকেই আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচ ঘিরে জেলার বিভিন্ন স্থানে বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের ভূবিরচর এলাকাসহ শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে সন্ধ্যার পর থেকেই দর্শকদের ভিড় বাড়তে থাকে। কিশোর, তরুণ, যুবক থেকে শুরু করে প্রবীণ—সব বয়সের ফুটবলপ্রেমীরা প্রিয় দলের জার্সি গায়ে ও হাতে আর্জেন্টিনার পতাকা নিয়ে খেলা দেখতে জড়ো হন।
সরেজমিনে দেখা যায়, খেলা শুরুর অনেক আগেই চায়ের দোকান, খোলা মাঠ ও বিভিন্ন মোড়ে বসানো বড় পর্দার সামনে দর্শকদের উপচেপড়া ভিড়। কোথাও বন্ধুদের আড্ডা, কোথাও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খেলা দেখার আয়োজন। বিশ্বকাপের আবহে পুরো এলাকা যেন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে ছিল চরম উত্তেজনা। প্রতিটি আক্রমণ, প্রতিটি গোলের সুযোগ আর প্রতিটি মুহূর্তে করতালি ও উল্লাসে মুখর হয়ে ওঠে দর্শকরা। অন্যদিকে মিশরের সমর্থকরাও নিজেদের দলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে উৎসাহ দিতে থাকেন। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে ছিল সুস্থ প্রতিযোগিতা ও খুনসুটি।
ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার জয় নিশ্চিত হতেই আনন্দে ফেটে পড়েন সমর্থকরা। সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের ভূবিরচর এলাকায় সঙ্গে সঙ্গেই বের হয় বিজয় মিছিল। "আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা" স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে চারপাশ। অনেকেই আতশবাজি ফোটান, ঢোল বাজিয়ে নাচতে থাকেন এবং একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা জানান।
এদিকে ঠিক সেই সময় শুরু হয় বৃষ্টি। কিন্তু বৃষ্টি যেন আনন্দে কোনো ভাটা ফেলতে পারেনি। বরং বৃষ্টিভেজা রাতেই সমর্থকদের উচ্ছ্বাস আরও বেড়ে যায়। তরুণদের অনেককে বৃষ্টিতে ভিজেই নাচতে, গান গাইতে দেখা যায়।
আর্জেন্টিনা সমর্থক রিফাত হোসেন বলেন, “বৃষ্টি আমাদের আনন্দ থামাতে পারেনি। প্রিয় দলের জয় উদযাপন করতে আমরা রাস্তায় নেমেছি। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।”
আরেক সমর্থক নাঈম আহমেদ বলেন, “অনেকেই নানা ধরনের কথা বলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাঠের খেলাতেই সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছে আর্জেন্টিনা। দলের এই জয় আমাদের জন্য অনেক গর্বের।”
খেলা দেখতে আসা রাকিব বলেন, “আমি ছোটবেলা থেকেই আর্জেন্টিনার সমর্থক। বিশ্বকাপ এলেই বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে খেলা দেখি। বড় পর্দায় সবাই মিলে খেলা দেখার আনন্দই আলাদা। আজকের জয় আমাদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।”
প্রবীণ দর্শক আব্দুল করিম বলেন, “বয়স হয়েছে, কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কমেনি। তরুণদের সঙ্গে বসে খেলা দেখতে খুব ভালো লাগে। আর্জেন্টিনার জয় দেখে অনেক আনন্দ লাগছে।”
স্কুল শিক্ষার্থী নাঈম আহমেদ বলেন, “সারাদিন ধরেই এই ম্যাচের অপেক্ষায় ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে পতাকা আর জার্সি পরে খেলা দেখতে এসেছিলাম। দলের জয় পাওয়ায় খুব ভালো লাগছে।”
মিশরের সমর্থক মো. সিয়াম হোসেন বলেন, “আমরা মিশরের সমর্থক হলেও ম্যাচটি দারুণ উপভোগ করেছি। হার-জিত খেলাধুলারই অংশ। ভবিষ্যতেও আমরা আমাদের দলের পাশেই থাকব।”
মিশরের আরেক সমর্থক ইমরান হোসেন বলেন, “আর্জেন্টিনা ভালো খেলেছে। তবে মিশরও লড়াই করেছে। আমরা চাই আগামী দিনগুলোতে দল আরও ভালো খেলুক।”
স্থানীয় চায়ের দোকানদার মো. শাহজাহান বলেন, “বিশ্বকাপ এলেই দোকানে মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। সবাই চা খেতে খেতে খেলা দেখে, আলোচনা করে। এতে ব্যবসাও ভালো হয়, আবার ফুটবল উৎসবও উপভোগ করা যায়।”
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কিশোরগঞ্জে বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে প্রতিবছরই উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। প্রিয় দলের খেলা উপলক্ষে বিভিন্ন এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখার আয়োজন, পতাকা টাঙানো, জার্সি পরা এবং বন্ধুদের সঙ্গে একত্রে খেলা উপভোগ করা এখন এক ধরনের সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
রাত যত গভীর হয়েছে, ততই বেড়েছে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস। বৃষ্টিভেজা পরিবেশ, আতশবাজির ঝলক, ঢোলের শব্দ এবং বিজয়ের স্লোগানে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। অনেকেই মোবাইল ফোনে সেই আনন্দের মুহূর্ত ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।
সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জে সৃষ্টি হয় এক ব্যতিক্রমী উৎসবের আবহ। ফুটবলপ্রেমীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে রাতভর চলা উদযাপন আবারও প্রমাণ করেছে—বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, আনন্দ এবং মিলনমেলারও অন্যতম বড় উপলক্ষ।
কেকে/ এমএস