একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্মের ওপর। কারণ তরুণদের শিক্ষা, সৃজনশীলতা, কর্মক্ষমতা ও নৈতিক শক্তির সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি শক্তিশালী জাতি। কিন্তু আজ সেই তরুণ প্রজন্ম মাদকের ভয়াবহ আগ্রাসনের শিকার। নীরবে, ধীরে ধীরে মাদক গ্রাস করছে দেশের অগণিত তরুণকে, বিপর্যস্ত করছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামোকে। এ সংকট এখন শুধু ব্যক্তিগত, পারিবারিক বা সামাজিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; এটি জাতীয় সংকট ও উদ্বেগের বিষয়। তাই যুবসমাজকে মাদকের আগ্রাসী থাবা থেকে রক্ষায় প্রয়োজন পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, আইনি ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেডের (আরএমসিএল) যৌথ গবেষণায় দেশে মাদক ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ওই গবেষণায় বলা হয়, দেশে আনুমানিক ৮১ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করেন। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে মাদকের সঙ্গে যুক্ত। গবেষণায় সিগারেটকে মাদক ব্যবহারের আওতায় ধরা হয়নি। আবার কেউ কেউ এ তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, বাস্তবে এ সংখ্যা দ্বিগুণ, আড়াই গুণ বা তারও বেশি হতে পারে।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের আট বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। দেখা গেছে, বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হারেও বড় পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে এই হার সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ০২ শতাংশ। এরপর রংপুরে ৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। রাজশাহীতে এ হার ২ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং খুলনায় ৪ দশমিক ০৮ শতাংশ। সংখ্যার হিসাবে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে প্রায় ২২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ মাদক ব্যবহার করেন। চট্টগ্রামে এ সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ ৭৯ হাজার এবং রংপুরে ১০ লাখ ৮০ হাজারের কাছাকাছি।
গবেষণার উদ্বেগজনক দিক হলো, মাদক গ্রহণের বয়স ক্রমেই কমে আসা। প্রায় ৩৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করেছেন। আর ৫৯ শতাংশের মাদক গ্রহণ শুরু হয়েছে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে। অর্থাৎ দেশের শিশু-কিশোর ও তরুণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ মাদকের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। মাদক ব্যবহারের পেছনে বন্ধুদের চাপ, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও হতাশাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কৌতূহল থেকেও মাদক গ্রহণ শুরু হয়। পরে তা ধীরে ধীরে নেশা বা অভ্যাসে রূপ নেয়।
মাদকের সহজলভ্যতাও পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তারা সহজেই মাদক সংগ্রহ করতে পারেন। ফলে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি এড়িয়ে অল্প বয়সেই অনেকে মাদকের জগতে ঢুকে পড়ছেন। দেশে ব্যবহৃত মাদকের তালিকায় সবচেয়ে ওপরে রয়েছে গাঁজা বা ক্যানাবিস। এর ব্যবহারকারী প্রায় ৬০ লাখ ৮০ হাজার। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন—প্রায় ২৩ লাখ ব্যবহারকারী। অ্যালকোহল, কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইনও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
মাদকাসক্তির পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। গবেষণা বলছে, একজন মাদক ব্যবহারকারী গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন। একই ব্যক্তি একাধিক ধরনের মাদক গ্রহণ করতে পারেন। ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ উৎপাদনশীল খাত থেকে বেরিয়ে মাদকের অবৈধ বাজারে চলে যাচ্ছে। মাদকের কারণে কর্মক্ষমতা কমে যায়, শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয় এবং কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মাদকের অর্থ জোগাড় করতে ব্যবহারকারীরা চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা বা অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। এর প্রভাব পড়ে পুরো পরিবারে।
চিকিৎসকরা বলছেন, মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; এর প্রভাব পড়ে পরিবার ও সমাজের ওপরও। দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যেতে পারে। মস্তিষ্ক, হৃদ্যন্ত্র, শ্বাসযন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হতাশা, মানসিক ভারসাম্যহীনতা ও আত্মহত্যার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে। মাদক সমস্যা মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সীমিত সুযোগ। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। অথচ অর্ধেকের বেশি ব্যবহারকারী মাদক ছাড়ার চেষ্টা করেছেন।
চিকিৎসা পাওয়া ব্যবহারকারীদের বড় অংশ পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং, পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তার অভাবের কথা জানিয়েছেন। তাঁদের ৬৯ শতাংশ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং এবং ৪১ শতাংশ কর্মসংস্থান সহায়তাকে জরুরি প্রয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে ৬৮ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, মাদক ব্যবহারের কারণে তারা পরিবার ও সমাজে অপবাদ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।
এ পরিস্থিতিতে মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে দেখার বদলে রোগী হিসেবে বিবেচনা করে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের আওতায় আনার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ শুধু আইন প্রয়োগ করে মাদকের চাহিদা কমানো সম্ভব নয়। এমন অবস্থায় পরিবারের অন্য সদস্য এবং সন্তানরাও মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাই সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ বিপদ মোকাবিলা করতে হবে। এ কারণে মাদক প্রতিরোধের শুরুটা পরিবার থেকেই করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে ঢাকার বাইরে সাত বিভাগে ২০০ শয্যার পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে বলেও তিনি জানান।
বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনের বড় দেশ না হলেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদক পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী অবস্থান, সমুদ্র ও নদীপথ এবং আঞ্চলিক মাদক পাচারের রুটের কারণে দেশটি চোরাকারবারিদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই সীমান্ত, নৌপথ ও অন্যান্য প্রবেশপথে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। শুধু অভিযান ও শাস্তি দিয়ে এ সংকটের সমাধান হবে না। মাদকের সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, কাউন্সেলিং ও খেলাধুলার সুযোগ বাড়াতে হবে। পরিবারেও সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।
মাদক থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, চিকিৎসক, ধর্মীয় নেতা, জনপ্রতিনিধি ও বেসরকারি সংগঠনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান এবং হতাশাগ্রস্তদের মানসিক সহায়তার সুযোগ বাড়ানোও জরুরি। কারণ মাদক এখন একটি বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। তাই প্রত্যাশা, মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু অভিযাননির্ভর না রেখে প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক পুনঃএকত্রীকরণের সমন্বিত কর্মসূচিতে নিতে হবে। তা না হলে মাদকের নীল দংশনে আরও একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালিস্ট ফোরাম
কেকে/এলএ