সারা দেশে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ অথবা কম সক্ষমতায় চলছে। বিশেষ করে কয়লাভিত্তিক বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোডশেডিং আরও প্রকট হয়েছে।
অনেক এলাকায় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। শিল্পকারখানাও উৎপাদন করতে পারছে না চাহিদামতো। তবে এই সংকটময় মুহূর্তে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা আদানির বিদ্যুৎ নিয়ে। আদানির কাছ থেকে চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। উৎপাদনক্ষমতার প্রায় অর্ধেক বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানি গ্রুপ।
এরই মধ্যে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এলো আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধের খবর। ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ২নম্বর ইউনিটটি হঠাৎ কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে এই বিপর্যয় ঘটে। ফলে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমে গেছে এবং দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, ঝড়ের কারণে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমায় আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। গত মাসের শেষ দিকে উৎপাদন বাড়িয়ে দিনের বেলায় ৯০০ মেগাওয়াট করে তারা। আর সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সরবরাহ করছিল তারা। তবে একটি ইউনিট বন্ধের পর উৎপাদন হচ্ছে ৭৫০ মেগাওয়াটের কম।
জানা যায়, আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি করে পিডিবি। ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট আছে এখানে। চাহিদা বুঝে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি সরবরাহ করার রেকর্ড আছে এই কেন্দ্রের।
এ বিষয়ে আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বয়লারে সমস্যা হয়েছে। এটি শীতল হতে ৪৮ ঘণ্টা লাগতে পারে। এরপর ত্রুটি মেরামতের কাজ শুরু হবে। তাই উৎপাদন বাড়তে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বেলা ৩টার প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই সময় দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। এ সময় বিদ্যুতের চাহিদা দেখানো হয়েছে ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। তবে এটি দিনের সর্বোচ্চ চাহিদার তুলনায় অন্তত ১ হাজার মেগাওয়াট কম।
অন্যদিকে, একই সময়ে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছিল ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যায়।
বিদ্যুতের হঠাৎ এই ঘাটতির কারণ জানিয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম জানান, হঠাৎ করে আদানির একটি ইউনিট আবার বন্ধ হয়ে গেছে। তারা দ্রুত তা মেরামতের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে দেশের আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আরএনপিএলের একটি ইউনিটও বন্ধ হয়েছে। সব মিলিয়ে একযোগে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের নতুন করে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া বাদবাকি পুরোনো সমস্যাগুলো তো আগের মতোই রয়েছে।
জাতীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (এলএনডিসি) বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বুধবার রাত ১১টায় আদানির বিদ্যুৎ হঠাৎ ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট থেকে ৭৫৮ মেগাওয়াটে নেমে আসে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াট, যা এক দিন আগেও ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ছিল।
শুধু আদানির কেন্দ্রেই নয়, গ্যাস ও কয়লার সংকটেও দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পিডিবি সূত্র বলছে, দুই মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাসের সংকট তীব্র হওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমেছে। এতে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এর পাশাপাশি পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ রয়েছে। পটুয়াখালীর আরেকটি কেন্দ্র এবং বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লা-সংকটের প্রভাব পড়েছে। কারিগরি ত্রুটিতে আশুগঞ্জের ৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকায় গ্যাস-সংকটের কারণে অন্তত সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ অথবা কম সক্ষমতায় চলছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেও একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
গ্রামে কী অবস্থা
বিদ্যুতের এমন ঘাটতিতে শহরাঞ্চলে দিনে চারবার করে বিদ্যুৎ গেলেও গ্রামের দিকে আবারও ৭ থেকে ১০ ঘণ্টার লোডশেডিং ফিরে এসেছে। ঢাকার দুই বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসি সূত্র বলছে, তাদের বিদ্যুৎ চাহিদায় ঘাটতি নেই। আর ঢাকার বাইরের বাকি চারটি বিতরণ সংস্থার সূত্র বলছে, চাহিদার তুলনায় খুব কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে আরইবি, যারা সারা দেশের গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের এজিএম (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেনেন্স) মোহাম্মদ বাইজিদ হোসেন শাহ বলেন, ফেনীতে পল্লী বিদ্যুতের ১৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে।
নেত্রকোণার পূর্বধলা উপজেলার বাঘবেড় গ্রামের বাসিন্দা আমির হোসেন বলেন, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। নেত্রকোণা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন বলেন, ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয়েছে ৫৯ মেগাওয়াট। তাই ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
হবিগঞ্জের কোথাও কোথাও প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। চা-পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ জরুরি। চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা-বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে প্রক্রিয়াজাত পাতা নষ্ট হয়। এতে লোকসান গুনতে হচ্ছে বাগানগুলোকে।
ঢাকার কেরানীগঞ্জের জিনজিরা বাসরোড এলাকার গৃহবধূ আমেনা বেগম বলেন, দিনে তো বিদ্যুৎ থাকেই না, প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে বাচ্চারা ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি শুরু করে। রাতে একটু ঘুমানোর সুযোগও হচ্ছে না।
ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪ (সদর দপ্তর) মহাব্যবস্থাপক গোলাম কাউসার তালুকদার বলেন, কেরানীগঞ্জে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ২৪০ মেগাওয়াট। প্রতিদিন প্রায় ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে।
আদানিকে তিন দফা চিঠি
বাংলাদেশের এ চরম দুঃসময়ে কেন আদানি চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিচ্ছে না, এর কোনো জবাব পাচ্ছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। চুক্তি অনুযায়ী আদানিকে পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে গত মাসেই পরপর তিন দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কিন্তু প্রতিশ্রুত বিদ্যুৎ দিচ্ছে না।
পিডিবির একজন কর্মকর্তা বলেছেন, সারা দেশে তীব্র গরমে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক চাহিদা বেড়েছে। এ মুহূর্তে কেন তারা বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে, তা জানার জন্য আগস্টে তিনটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রতিবারই তারা জানিয়েছে, কয়লা ভিজে গেছে অথবা কয়লা পরিবহনের রেললাইন নষ্ট। তবে তারা এও জানিয়েছে, কয়েকদিনের মধ্যে পুরো বিদ্যুৎ সরবরাহ দেবে।
কেকে/ এমএস