দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিনই এই রোগে প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৪১ জন মারা গেছেন। আর মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ২২০ জনে। এর মধ্যেই আগামী দুই মাস পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এর মধ্যেই ডেঙ্গুর চিকিৎসায় নানা অব্যবস্থাপনার তথ্য উঠে এসেছে। রোগীর শরীরে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি রাজধানীর এক সরকারি হাসপাতালের ডেঙ্গু রোগীকে হামের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হাসপাতালে পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন হাসপাতালে দালাল ও প্রতারক চক্রের দৌরাত্ম্য কমছে না। এতে রোগীদের ভোগান্তি আরও বেড়েছে।
রাজধানীর মুগদা সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এ শিশুকে হামের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হাসপাতালে পাঠানোর অভিযোগ করেছেন তার স্বজনরা। ওই শিশুর নাম সামিয়া (৭)। তার মায়ের নাম নাজমা এবং বাবার নাম বাচ্চু। প্রায় সাত দিন ধরে শিশুটি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিল। তাদের গ্রামের বাড়ি রংপুর। ঢাকায় তারা ডেমরায় থাকে।
শিশুটির মা নাজমা জানান, তার মেয়ে বেশ কয়েকদিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে পাঠিয়েছে মুগদা সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক।
এ বিষয়ে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালের পরিচালনা কর্তৃপক্ষের মেহেদি হাসান বলেন, এ হাসপাতালে তিন মাস আগে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা হতো। এখন শুধু হামের চিকিৎসা হয়। হাম অনেক ছোঁয়াচে রোগ এ কারণে অন্য রোগীদের এ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় না। এমনকি আউটডোরও অন্য রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না।
মুগদা সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. নূরুল হককে এ বিষয়ে জানানো হলে তিনি বলেন, রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। রোগীর বয়স বিবেচনায় এ হাসপাতালটিতে উপযুক্ত চিকিৎসা হবে। ডেঙ্গু রোগীকে কেন এমন হাসপাতালে রেফার করা হলো— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু ও হাম রোগীকে একসঙ্গে একই ওয়ার্ডে রাখা যাবে না, কারণ এতে সংক্রমণের শঙ্কা আছে।
অপরদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালেও রোগীর চাপ লক্ষ করা গেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বেড়ে যাওয়ায় ওয়ার্ডগুলোর পাশাপাশি বারান্দায় বিছানার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা বেড না পেয়ে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসাসেবা প্রসঙ্গে ঢামেক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ হাসপাতালে সারা বছরই রোগীর অতিরিক্ত চাপ থাকে এবং এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়লেও হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় কোনো ঘাটতি বা সমস্যা হচ্ছে না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপ-পরিচালক ডা. আশরাফুল আলম জানান, এখন হাসপাতালে ২০৫ জন রোগী আছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ছাড়পত্র পেয়েছেন ৫৪ জন।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গুও ওয়ার্ডেরও একই চিত্র। বহু রোগী বেড না পেয়ে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মনির-উজ-জামান বলেন, ‘আমরা হাসপাতালে বেড সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ জন্য কাজ করছি। হাসপাতালে রোগীর ভিড় কমাতে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রথমিক পর্যায়ে যদি রোগ প্রতিরোধ করা যায়, তাহলে টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা কমবে।’
অপরদিকে ডেঙ্গু রোগীদের শরীরে মেয়াদোত্তীর্ণ বা নষ্ট ওষুধ ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুকে দূষিত বা নষ্ট স্যালাইন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
স্বজনদের দাবি, প্রায় আট ঘণ্টা ধরে ওই স্যালাইন শিশুটির শরীরে প্রবেশ করেছে। পরে স্যালাইনের ভেতরে ফাঙ্গাস বা ছত্রাকের মতো পদার্থ দেখতে পান তারা। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্যালাইনটি সরিয়ে নেয়।
এছাড়া রাজধানীর রামপুরায় ‘ডেল্টা হেলথ কেয়ার’ হাসপাতালে এক বছর আগের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুর শরীরে পুশ করার ঘটনা ঘটেছে। আর এই ওষুধটি বিক্রি করা হয় হাসপাতালের ফার্মেসি থেকেই।
এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই মজুদ থাকা ওষুধের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে কিনা তা নিয়মিত পর্বেক্ষণ করতে হবে। প্রত্যেকটি ওষুধের মান নির্ণয় করে রোগীদের জন্য ব্যবহার করতে হবে। কোনো ওষুধ নষ্ট হলে বা মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে তা কোনো অবস্থায় রোগীর শরীরে ব্যববহার করা যাবে না।
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে দালাল ও প্রতারকচক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের কারণে ডেঙ্গুসহ অন্য রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক রোগীর অভিযোগ টাকা দিলে সুচিকিৎসা দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কর্মীরা।
এ বিষয়ে মুগদা সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. নূরুল হক বলেন, হাসপাতালে দালাল ও প্রতারকচক্র প্রতিরোধে অমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি। যদি কোনো রোগী বা গণমাধ্যমকর্মী এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানাতে পারেন, তাহলে ব্যবস্থা কঠোর নেওয়া হবে। এমনি কোনো কর্মকর্তা অসদাচারণে যুক্ত থাকলে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া শঙ্কা : সাধারণত বর্ষা পরবর্তী সময়কে, অর্থাৎ আগস্ট থেকে অক্টোবরকে ডেঙ্গুর ‘পিক সিজন’ বা ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ মৌসুম বলা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও বেশি খারাপ হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, শুধু সেপ্টেম্বরেই ৩০ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হতে পারে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়বে। শুধু তাই নয়, অক্টোবরেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কাছাকাছি থাকবে।
এদিকে আইইডিসিআরবির পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে আমরা উদ্বেগজনক অবস্থায় আছি। দিনদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে, হামের কারণে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো এমনিতেই অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গু নতুন করে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। সব মিলিয়ে এটি আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি নয়, বরং বেশ চাপের।’
কেকে/ এমএস