একটি শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়। একটি জনপদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি, ইতিহাস ও প্রজন্মের স্বপ্নের সঙ্গে এর দীর্ঘ পথচলা জড়িয়ে থাকে। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বেলকা এমসি উচ্চবিদ্যালয় তেমনই প্রতিষ্ঠান। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর শতবর্ষ পেরিয়ে আজও শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে বিদ্যালয়টি।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত বিদ্যালয়টির ইতিহাসের শুরু আরও আগে। অশিক্ষা, কুসংস্কার ও কূপমণ্ডূকতার সময়ে বেলকা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী চরিতাবাড়ীতে ১৯০৮ সালে মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে একটি এমভি (মডেল ভার্নাকুলার) বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে এটি ‘বেলকা জজ এমই স্কুল’ নামে পরিচিতি পায়।
শিক্ষানুরাগী কৃষ্ণ মোহন দত্ত, তারকনাথ সরকার, ঋষিকান্ত ভৌমিক, সাদাত আলী মুন্সি, রজনীকান্ত সরকার ও যতীন্দ্রনাথ মল্লিকসহ স্থানীয়দের প্রচেষ্টা এবং রংপুর জেলা বোর্ডের সহায়তায় ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেলকা জর্জ মিডল ইংলিশ স্কুল’। ‘জর্জ’ বলতে বালক, ‘মিডল’ বলতে অষ্টম শ্রেণি এবং ইংরেজি শিক্ষার প্রাধান্যের কারণে নামের সঙ্গে ‘ইংলিশ’ যুক্ত করা হয়।
ভৌগোলিক কারণে ১৯১৮ সালে বিদ্যালয়টি পুরাতন বেলকা বাজারের প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণে বেলকা মৌজায় স্থানান্তর করা হয়। তখন সীমিত শিক্ষার্থী, দুর্বল অবকাঠামো ও আসবাবপত্রের সংকট ছিল। এলাকাবাসী ‘শিক্ষাকর’ দিতে না পারায় বিদ্যালয়ের দুরবস্থার বিষয়টি কসিমবাজার মহারাজার নজরে আসে। ১৯১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর বিদ্যালয়ের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হন কসিমবাজার মহারাজা। বিদ্যালয়ের অবস্থা দেখে তিনি জমি দেওয়ার ঘোষণা দেন এবং পরে ৬৬ শতক জমি দান করেন।
একই সঙ্গে এমই স্কুলকে এইচই (হাই ইংলিশ) স্কুলে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। চরিতাবাড়ীর বিদ্যালয়টিও পরে বেলকার বিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত হয়। নতুন নাম হয় ‘বেলকা মহারাজা কাসিমবাজার হাই ইংলিশ স্কুল’, যা পরবর্তীতে ‘বেলকা মহারাজা কসিমবাজার (এমসি) উচ্চবিদ্যালয়’ নামে পরিচিতি পায়।
বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাবু প্রণব মুখার্জী। পরে কলকাতার বিদ্বান বাবু দিবাকর চ্যাটার্জি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩১ সালে প্রফুল্ল কুমার দাসের সম্পাদনায় বিদ্যালয় থেকে ‘ লাইট মোর লাইট’ মনোগ্রাম-সম্বলিত ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। দীর্ঘ পথচলায় তিস্তার ভাঙনও বিদ্যালয়টির জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
১৯৮৪ সালে নদীভাঙনের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়। সুন্দরগঞ্জ সদর-মওলানা ভাসানী সেতু সংযোগকারী সড়ক থেকে প্রায় ৩০০ গজ দক্ষিণে এবং বেলকা থেকে গাইবান্ধা জেলা সদরের সংযোগ সড়কের পশ্চিম পাশে বেলকা মৌজায় বিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থান।
বর্তমানে বিদ্যালয়ের আয়তন ৫ একর ৭০ শতক। মানবিক, বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও ভোকেশনাল শাখায় প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ২৯ জন। প্রধান শিক্ষক মো. আহসান হাবীব খোকন ২০০১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি যোগদানের পর বিদ্যালয়ে ২৫টি শ্রেণিকক্ষ, প্রধান শিক্ষকের অফিস, শিক্ষক মিলনায়তন, ল্যাব, অডিটোরিয়াম, বিশ্রামাগার, মসজিদ, ওয়াশরুম, মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল গ্যারেজ, সততা স্টোর, শহীদ মিনার ও ফুটবল মাঠসহ বিভিন্ন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। রয়েছে অ্যাকুরিয়াম ও সিসি ক্যামেরা। জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে প্রধান শিক্ষক চারবার উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানটি দুইবার উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পেয়েছে।
শতবর্ষের পথচলায় বিদ্যালয়টি তৈরি করেছে অসংখ্য কৃতি শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে রয়েছেন ভারতের সাবেক পাটমন্ত্রী দেবব্রত মজুমদার, দেশভাগের পর পাকিস্তানের শিক্ষা বিভাগের প্রথম উপ-মহাপরিচালক শেখ সদর উদ্দিন, গাইবান্ধা সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও সাবেক এমপি খন্দকার রেজাউল আলম, সুন্দরগঞ্জ আ. মজিদ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান খেতাব উদ্দিন বসুনিয়া, সাবেক এমপি ও দুবারের উপজেলা চেয়ারম্যান ওয়াহেদুজ্জামান সরকার বাদশা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম সরকার লেবু, রংপুর জেলা বোর্ডের সাবেক সদস্য গিয়াস উদ্দিন বক্তা ও বীর প্রতীক আব্দুল মাজেদ। এ ছাড়া সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক ও সমাজসেবায় যুক্ত হয়েছেন বিদ্যালয়ের বহু প্রাক্তন শিক্ষার্থী। খেলাধুলা, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে বিদ্যালয়টির সুনাম।
১৯১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিদ্যালয়ের পরিদর্শন বহি ও বিভিন্ন রেকর্ডপত্রে এর দীর্ঘ ইতিহাস সংরক্ষিত রয়েছে। সময়ে নাম, ঠিকানা ও শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, তিস্তার ভাঙন মোকাবিলা করতে হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মূল লক্ষ্য বদলায়নি। বিদ্যালয়টির চারপাশে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বেলকা বাজার, পোস্ট অফিস, উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, বেলকা মনিকা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বেলকা মনিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেলকা ডিগ্রি কলেজ, ইউনিয়ন ভূমি অফিস, বেলকা ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব বেলকা বটতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাসস্ট্যান্ড।
প্রধান শিক্ষক মো. আহসান হাবীব খোকন বলেন, ‘বেলকা এমসি উচ্চবিদ্যালয় শতবর্ষের ঐতিহ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এ দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি যেমন অনেক কৃতি শিক্ষার্থী তৈরি করেছে, তেমনি সময়ের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন ও নানা প্রতিকূলতাও মোকাবিলা করেছে। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ তৈরিতে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ধরে রেখে শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত করা এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য যোগ্য করে তোলাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।’
অশিক্ষা ও কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে যে শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে বিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়েছিল, শতবর্ষ পরও তা জ্বলছে। তিস্তার চরাঞ্চলসহ আশপাশের সুবিধাবঞ্চিত ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সুযোগ তৈরিতেও প্রতিষ্ঠানটি ভূমিকা রাখছে। সময় ও প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু ১৯১৩ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত শিক্ষার এ আলোকযাত্রা থামেনি।
কেকে/এআই