ছোট্ট শিশু হাফসা (৬) ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত। মায়ের হাত ধরে চট্টগ্রাম থেকে এসেছে মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে। শৈশবের দুরন্তপনার কারণে সে কিছুক্ষণ পরপরই নিজে থেকেই দৌড়াদৌড়ি করছিল। হাফসা অবুঝ শিশু হলেও তার রোগটা মারাত্মক। শিশুটির মা হাসিনা বেগমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শিশুটি তিন বছর ধরে ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত। এ কয়েক বছরে মেয়ের চিকিৎসার জন্য ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে।
চিকিৎসার খরচ জোগাতে জমি বিক্রি করতে হয়েছে, ঋণ করতে হয়েছে। এরপরও কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছে না শিশুটির পরিবার। এখন আত্মীয়স্বজন ও এলাকাবাসীর দানে চলছে চিকিৎসা। এরপরও দুরাবস্থার শেষ নেই, কারণ খরচ কমাতে সরকারি হাসপাতালে এলেও, সেটা তেমন একটা কমছে না।
তার অভিযোগ হাসপাতালের দালাল ও অসাধু কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের কারণে গ্লাভস ও সিরিঞ্জ কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। কারণ জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা বলছে যে সাপ্লাই নেই। এমনকি ভর্তুকি দেওয়া ওষুধও কিনতে হচ্ছে বেশি দামে।
হাসপাতালের কয়েকজন রোগীর সঙ্গে কথা বলে একই চিত্র পাওয়া গেছে। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত রোকেয়ার (৫৫) ছেলে রাসেলের অভিযোগ, হাসপাতাল থেকে কিছু ওষুধ দিলেও ৩-৪টা দামি ওষুধ কিনতে হয় বাইরে থেকে। অনেক সময় ফ্রি ওষুধের বিষয়ে বলে সাপ্লাই নেই, বাইরে থেকে কিনুন। এছাড়া সরকারি কেমোথেরাপি (ভর্তুকি দেওয়ার কারণে) ৭০০-৮০০ টাকায় সম্পন্ন হয়। কিন্তু, অনেক সময় তা নেওয়া হয় ৮ হাজার টাকা। এখন পর্যন্ত প্রায় ৬-৭ টাকা খরচ হয়েছে চিকিৎসার জন্য। তিনি দিনমজুর হওয়ার কারণে চিকিৎসার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
রাসেল আরও জানান, হাসপাতালের আশপাশে থাকা ফার্মেসিগুলো অনেক বেশি দামে ওষুধ বেচে। হাসপাতাল থেকে সরকারি ওষুধ না দিলে বাধ্য হয়েই তাকে এসব ওষুধ কিনতে হয়।
আরও অভিযোগ রয়েছে, মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালের আশপাশে অসংখ্য দালাল ও প্রতারকচক্রের আড্ডাখানা। তারা কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজোশ করে সরকারি ওষুধ বেশি দামে বিক্রি করছেন। এমনকি রোগীদের জোর করে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া ওষুধ কোম্পানির সেলস ও মার্কেটিংয়ের লোক তো চিকিৎসক ওষুধ লিখে দেওয়ার পর, তার ছবি তুলে নেন।
তারা আরও জানান, দেশের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষায়িত সরকারি ক্যানসার হাসপাতাল হওয়ার কারণে এখানে প্রচুর ভিড় থাকে। অনেক সময় চিকিৎসা নিতে হাসপাতালের রাস্তায় মাদুর পেতে থাকতে হয়। এমনকি ঠিকভাবে তারা চিকিৎসা পাচ্ছেন না।এমনকি কেমোথেরাপির তারিখও পরিবর্তন করা হয়।
রোগীরা ওষুধ না পাওয়ার বিষয়ে মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বলেন, “হাসপাতালে সরকারি বরাদ্দ খুব কম। সাপ্লাই নেই—এ কারণে রোগীরা ওষুধ পাচ্ছে না।”
তিনি আরও বলেন, “রোগীদের রান্নার জন্য সরকারি গ্যাসও সরবরাহ করা হচ্ছে না এক মাস ধরে। বাধ্য হয়ে এলপি গ্যাস ব্যবহার করছি। এখন সরকারের উচিত অতিরিক্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা। ওষুধ সহজলভ্য করা। নইলে রোগীদের নিয়ে হিমশিম খেতে হবে। এমন দুরাবস্থার মধ্যেও আমরা রোগীদের প্রায় ৮০ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ করি।”
হাসপাতালের দালাল ও অসাধু কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “হাসপাতালে দালাল ও অসাধু কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের বিষয়টি অস্বীকার করছি না। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি এদর নির্মূলে। এখন পর্যন্ত আমি নিচে ৫-৭ জনকে বহিস্কার করেছি হাসপাতাল থেকে। কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। হাসপাতালে প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে প্রচুর জনবল দরকার, কিন্তু আমাদের তা নেই।”
ক্যানসারের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে প্রচুর রোগী ভিড় করছে। এখন কী করণীয়? এ প্রশ্নের জবাবে ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বলেন, “সরকার সারা দেশে বিভাগীয় পর্যায়ে হাসপাতাল করবে। তখন রোগীর চাপ কমবে। এখন আমি হাসপাতালের বেড ৭০০ করার জন্য চেষ্টা করছি। এ প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। পরে আরও সিট বাড়িয়ে ১০০০ শয্যা করা হবে।”
রোগীদের বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপ-পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আবু নোমান মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী বলেন, “আমাদের হাসপাতালে জনশক্তি খুব কম। আমরা ৩০০ বেডের রোগীদের ঠিক মতো পরিচালনা করার মতো সক্ষম, কিন্তু সেবা দিচ্ছি ৭০০ বেডের রোগীদের। এ কারণে বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। তবে আমরা তা সমাধানে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। এমনকি রোগীদের খাবার রান্নার জন্য সরকারি গ্যাস না পাওয়ায় আমরা নিজ খরচে এলপি গ্যাস দিচ্ছি। এ জ্বালানিসংক্রান্ত বিল সরকার থেকে পাচ্ছি না।”
ক্যানসার আক্রন্ত রোগীদের বেশিরভাগ গরিব। এমনকি চিকিৎসার জন্য বাইরে ঘরভাড়া করে থাকার সামর্থ্য নেই। অনেকে চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিঃস্ব। এর সমস্যার সমাধান কী? এসব প্রশ্নের জবাবে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. হাসান শাহরিয়ার কল্লোল বলেন, “সরকারি ইনভেস্ট না বাড়লে এসব সমস্যার সমাধান হবে না। ডাক্তারদের শিক্ষা ও রোগীদের চিকিৎসায় সরকারকে আরও অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ কম। সরকারের পরিপূর্ণ মনোযোগ পেলে ক্যানসারসহ অন্য রোগীদের সুচিৎিসা নিশ্চিত হবে।”
কেকে/সাশ