বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬,
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তা দিতে আগ্রহী নেদারল্যান্ডস, স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ      ● ডেঙ্গু সচেতনতায় পাড়া-মহল্লায় মাইকিংয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর      ● জয়ের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরল বাংলাদেশ, আফগানদের অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ      ● হাম-ডেঙ্গুর বিষাক্ত ছোবল, এক দিনে ১৫ মৃত্যু      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৯ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৯৫৪      ● হামের উপসর্গে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১২১৩      ● বিশ্বব্যাংকের ১০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা নিয়ে আলোচনা চলছে : অর্থমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ডেঙ্গু এখন মৃত্যু পরোয়ানা
শরীফ আহমেদ ইমন
প্রকাশ: বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:৫২ এএম

ইট-পাথরের এই যান্ত্রিক নগরে এখন দিন বদলের পালায় ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। এক বিন্দু জমল জল—আর তাতেই ওঁৎ পেতে বসল নরকদূত। সামান্য একটি কামড়, মুহূর্তেই সব আলো নিভিয়ে কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ। রাজধানীর হাসপাতালগুলোর বারান্দা থেকে শুরু করে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র— সবখানেই এখন রক্তিম প্লাটিলেটের হিসাব আর স্বজনদের বুকফাটা কান্নার রোল। অবহেলায় জমে থাকা এক ফোঁটা জল আজ প্রতিটি পরিবারের দরজায় ঝুলিয়ে দিয়েছে মৃত্যু পরোয়ানা। অথচ ডেঙ্গুর এ ভয়াল থাবা থেকে সুরক্ষায় সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতি আর নগরবাসীর উদাসীনতা যেন একে অপরকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের স্ক্রিনে ভেসে উঠছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর মৃত্যুর মিছিল। রাজধানীর হাসপাতালগুলোর বারান্দা থেকে মফস্বলের ক্লিনিক— সবখানেই এখন একই দৃশ্য। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের সতর্কবার্তা আর ডেঙ্গু রোধে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও, বাস্তবে এ ক্ষুদ্র পতঙ্গের মরণ কামড় যেন সব প্রতিরোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কেড়ে নিচ্ছে একের পর এক সম্ভাবনাময় জীবন। 

একদিনে আরও ৯ জনের মৃত্যু : 

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে মশাবাহিত এই রোগে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৬ জনে। এর মধ্যে চলতি অক্টোবর মাসের কেবল প্রথম ১৩ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন ৭১ জন, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি শঙ্কাড়জনক করে তুলেছে। 

এক হাজার ৯৫৪ জন গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে এ বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ তিন হাজার ৩৯৬ জন। গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। 

প্রতিবেদনে গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃতদের মধ্যে পাঁচজন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা। এ ছাড়া খুলনা বিভাগে দুজন এবং চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগে একজন করে মারা গেছেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত ৯৭ হাজার ২৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। এদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ছাড়পত্র পেয়েছে এক হাজার ৯৬৫ জন। 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আগের মাসে অর্থাৎ আগস্টে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছিল ৪৩ জনের। এ ছাড়া জুলাই মাসে ৩৬, জুনে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। মে মাসে ১, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। 

অধিদপ্তরের নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত আগস্ট থেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। যা সেপ্টেম্বরে বড় আকার ধারণ করেছে। অক্টোবরে বাড়ছে আরও। গত মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর ৪৩ হাজার ৭৭৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর আগের মাসে আগস্টে যা ছিল ২০ হাজার ৫৩৬। 

জুন মাসে দুই হাজার ৯০৬ এবং জুলাই মাসে ৯ হাজার ২০৬ জনের ডেঙ্গু শনাক্তের তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এ ছাড়া জানুয়ারিতে এক হাজার ৮১, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ এবং মে মাসে ৭১৪ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এদিকে চলতি অক্টোবরের ১৩ দিনেই ২৩ হাজার ৭৭৬ জনের ডেঙ্গু শনাক্তের তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ২১-৩০ বছর বয়সিরা : 

ডেঙ্গুর ভয়াল থাবায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে তরুণ সমাজ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিলে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সি তরুণ-তরুণীরা। কর্মমুখী এ বয়সের মানুষগুলোই এখন ডেঙ্গুর প্রধান শিকার হচ্ছেন। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণরা সাধারণত পড়াশোনা, চাকরি বা অন্যান্য কাজে ঘরের বাইরে বেশি সময় কাটান। ফলে এডিস মশার কামড় খাওয়ার ঝুঁকি তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি থাকে। এছাড়া অনেকেই সাধারণ জ্বর বা শরীর ব্যথাকে শুরুতে গুরুত্ব দিতে চান না কিংবা ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য দেরি করে ফেলেন। যখন হাসপাতালে আসেন, ততক্ষণে রোগটি জটিল রূপ নেয়। 

চিকিৎসকরা বলছেন, তরুণদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও ভাইরাসের মারাত্মক স্ট্রেইন এবং দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার কারণে এ বয়সিদের মধ্যে মৃত্যুর হার বাড়ছে। 

আগাম প্রস্তুতিতে মৃত্যুহার কমেছে ৪০ শতাংশ : 

ডেঙ্গু মোকাবিলায় চার মাস আগে থেকে পরিকল্পনা গ্রহণ, সমন্বিত পদক্ষেপ ও চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ফলে এ বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত। আক্রান্তদের মধ্যে আগে প্রতি হাজারে পাঁচজনের মৃত্যু হলেও বর্তমানে তা কমে তিনজনে নেমে এসেছে বলে দাবি করেন তিনি। গতকাল বাংলা একাডেমিতে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক এক সেমিনার শেষে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। 

সরকারের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, এবার সরকার আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায় চার মাস আগেই সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রায় দুই মাস আগে পূর্বাভাস দিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, সেপ্টেম্বরের শেষ থেকে অক্টোবরজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে, যা নভেম্বর পর্যন্ত চলতে পারে। 

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তুলে ধরে ডা. মুহিত জানান, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউটসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রায় এক হাজার তরুণ স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। এ ছাড়া প্রতি শনিবার দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। স্কুল-কলেজ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমেও দেশব্যাপী এ কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। 

তিনি জানান, এবার ঢাকা ও খুলনা বিভাগে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেশি। সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, তাদের দল এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মশা ও লার্ভা ধ্বংসে দিনরাত কাজ করছেন। 

ডেঙ্গুর সম্ভাব্য টিকা নিয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তার ভাষ্য, বিশ্বে বর্তমানে দুই থেকে তিনটি ডেঙ্গুর টিকা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে প্রায় ৩০টি দেশে মূলত বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবহারের অনুমোদন পেয়েছে। সম্প্রতি ভারতেও একটি টিকা বেসরকারিভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশে টিকার ব্যাপক ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকার সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। 

তিনি বলেন, কোটি কোটি মানুষের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে জড়িত। তাই বিজ্ঞানীদের মতামত, ক্লিনিক্যাল তথ্য এবং দেশের মানুষের ওপর টিকার কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। 

সচেতনতায় পাড়া-মহল্লায় মাইকিংয়ের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর : 

ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়াতে পাড়া-মহল্লায় মাইকিং এবং জুমার নামাজের খুতবায় বক্তব্য দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণবিষয়ক এক সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন। এ তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব হাসান শিপলু। 

সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বললেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় মানুষ বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন, সেসব এলাকায় প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।’ 

এ সময় ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। সভায় সরকারি আবাসিক কোয়ার্টার ও হাসপাতাল প্রাঙ্গণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার বিষয়েও সিদ্ধান্ত হয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রম কার্যকর করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। 

সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  ডেঙ্গু   মৃত্যু পরোয়ানা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close