আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের কারণে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। এসব দেশে ঋণ পরিশোধের হার কয়েক বছরে ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে তিনি ন্যায্য রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় গুরুত্ব দিয়েছেন।
ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে রোববার (১৭ অক্টোবর) আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নিজেদের নীতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ন্যায্যভাবে রাজস্ব সংগ্রহ, ধনীদের কর ও সামাজিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণের মাধ্যমে এসব দেশকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি বলেন, ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান উদ্দেশ্য সামনে রাখতে হবে। প্রথমত, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন পথ তৈরি করা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) অন্যান্য প্রযুক্তির উন্নয়নে অংশ নেওয়া। দ্বিতীয়ত, সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
জর্জিয়েভা বলেন, বিশ্বের সব জায়গার মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র দেশের মানুষ মুদ্রাস্ফীতি পছন্দ করে না। মুদ্রাস্ফীতি দরিদ্র মানুষের ওপর করের মতো প্রভাব ফেলে। মানুষ অনিশ্চয়তাও পছন্দ করে না। তারা সুস্পষ্ট নীতি চায় এবং সরকার বেসরকারি খাতের জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করবে বলে প্রত্যাশা করে, যাতে উদ্যোক্তারা অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারেন।
তিনি বলেন, প্রতিকূল আর্থিক পরিস্থিতির সময় নিম্ন আয়ের দেশগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই এসব দেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
আইএমএফের ভূমিকা তুলে ধরে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত সম্পদ নিশ্চিত করতে সংস্থাটি নিরলসভাবে কাজ করছে। দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রবৃদ্ধি ট্রাস্টের (পিআরজিটি) মাধ্যমে সহজ শর্তে অর্থায়নের জন্য সদস্যদের সমর্থন বাড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার ফলে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পরিমাণ তিন গুণেরও বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে।
দেশগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো দেশ নিজের অর্থায়ন সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারলে তা সে দেশের জনগণের জন্য অনেক বেশি সুফল বয়ে আনে।
ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে
জর্জিয়েভা বলেন, অনেক নিম্ন আয়ের দেশে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। কারণ, বিগত বছরগুলোতে এসব দেশের ঋণের মাত্রা কমানো এবং রাজস্বের স্থায়িত্ব জোরদার করতে একসঙ্গে কাজ করেছে আইএমএফ।
তিনি বলেন, তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধনী দেশগুলোতে ঋণ ও জিডিপির অনুপাত বাড়ছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ অনুপাত সামান্য কমছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সুদের হারের কারণে ঋণ কমানোর পরও রাজস্বের তুলনায় ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়ে যাচ্ছে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে গত কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধের হার ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, উচ্চ ঋণের চাপে থাকা দেশগুলোর ঋণ পুনর্গঠনের প্রয়োজন হলে দ্রুত ও কার্যকরভাবে সহায়তা করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব। আবার কোনো দেশের ঋণ টেকসই হলেও তারল্যসংকট থাকলে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে সহায়তা, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরিতে সহযোগিতা করতে হবে।
তিনি বলেন, সম্মিলিতভাবে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া গেলে তা মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমেছে ২ শতাংশ
মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, অঞ্চলটির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কমানো হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (মেনা) অঞ্চলের অনেক দেশ সংস্কার এবং অর্থনৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে।
তিনি বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলোর কথা উল্লেখ করেন। তার মতে, এসব দেশে গত কয়েক বছরে জোরালো সংস্কার হয়েছে। ফলে রাজস্ব ব্যবহার করে বর্তমান অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
তবে এ সংকটের সবচেয়ে খারাপ দিক শুধু আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এর প্রভাব আরও উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ইরাক ও লেবাননকে সহায়তায় গুরুত্ব
জর্জিয়েভা বলেন, মেনা অঞ্চলের কিছু দেশ অন্যদের তুলনায় বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে ইরাক ও লেবাননের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, ইরাকের কর্তৃপক্ষ আইএমএফের কাছে একটি সহায়তামূলক কর্মসূচির অনুরোধ করেছে। দেশটিকে আর্থিক ও নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আইএমএফ দৃঢ়ভাবে কাজ করবে।
লেবাননের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশটির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আইএমএফের নিবিড় আলোচনা চলছে। এ আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। যৌথভাবে আরও কিছু কাজ সম্পন্ন করা গেলে সফল হওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
তিনি বলেন, মেনা অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়া আইএমএফের গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ ক্ষেত্রে ইরাক ও লেবাননের জন্য সহায়তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এ ছাড়া মিশরের সঙ্গে আইএমএফের চলমান কর্মসূচি বছরের শেষের দিকে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। জর্ডানের সঙ্গে একটি সফল কর্মসূচি রয়েছে বলে জানান তিনি।
জর্জিয়েভা বলেন, বর্তমান সংকটের সময়ে আইএমএফের ভূমিকা শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নীতিগত সহায়তার ক্ষেত্রেও সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
কেকে/সাশ