বিশ্বের আর্থিক খাতের পরিবর্তিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আর্থিক খাত মূল্যায়ন কর্মসূচি (এফএসএপি) সংস্কার করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ২০২৬ সালের পর্যালোচনার পর কর্মসূচিটিকে আরও ঝুঁকিভিত্তিক, নমনীয় ও দেশভিত্তিক করা হচ্ছে।
নতুন কাঠামোয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, সরকারি ঋণ এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আন্তসংযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি মূল্যায়নের সুপারিশ বাস্তবায়ন, নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা ও কারিগরি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ষষ্ঠ দিনে ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়নের ভবিষ্যৎ: কর্মদক্ষতা, মনোযোগ এবং প্রভাব শক্তিশালীকরণ’ শীর্ষক সেমিনারে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইএমএফের মুদ্রা ও পুঁজিবাজার বিভাগের উপপরিচালক মিকায়েল উরবানভা এবং গ্রিসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের অভিজ্ঞতা থেকে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক এফএসএপি চালু করে। এ কর্মসূচির আওতায় ব্যাংক, বিনিয়োগ তহবিল, বিমা প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক বাজারের অবকাঠামো মূল্যায়ন করে আর্থিক খাতের দুর্বলতা চিহ্নিত এবং সংস্কারের সুপারিশ করা হয়। আইএমএফ আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং বিশ্বব্যাংক আর্থিক খাতের উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়। ২০১০ সাল থেকে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক।
চার ক্ষেত্রে পরিবর্তন
মিকায়েল উরবানভা বলেন, ২০২৬ সালের পর্যালোচনায় কর্মসূচির আওতা, সুপারিশের কার্যকারিতা, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার দক্ষতা এবং দেশগুলোর অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। নতুন কাঠামোয় প্রতিটি দেশের ঝুঁকি ও প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্যায়নের পরিধি নির্ধারণ করা হবে। উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য সুপারিশগুলো আরও বাস্তবায়নযোগ্য করা হবে।
তিনি বলেন, কমসংখ্যক মিশন, নমনীয় সময়সূচি এবং দায়িত্বশীলভাবে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া সহজ করা হবে। আইএমএফের আর্টিকেল ফোর পরামর্শের সঙ্গে এফএসএপির সুপারিশের সংযোগ বাড়ানো হলে বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সমন্বয় করা সহজ হবে। স্বেচ্ছামূলক মূল্যায়নের সুযোগ বাড়িয়ে আরও বেশি দেশকে কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
মূল্যায়নে গ্রিসের অভিজ্ঞতা
ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু বলেন, এফএসএপি জাতীয় কর্তৃপক্ষকে দৈনন্দিন তদারকির বাইরে গিয়ে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে মূল্যায়নের সুযোগ দেয়। আইএমএফের স্বাধীন মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পাওয়া যায়। এগুলো বাস্তবায়ন করলে তদারকি কাঠামো উন্নত হয়।
তিনি বলেন, মূল্যায়নে সময়, অর্থ ও জনবল ব্যয় হলেও এর সুফল গুরুত্বপূর্ণ। পৃথক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি বিশ্লেষণের পাশাপাশি পুরো আর্থিক ব্যবস্থার আন্তসংযোগ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
গ্রিসের ব্যাংক খাতের পরিবর্তন তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশটির আগের এফএসএপি মূল্যায়ন হয়েছিল ২০০৬ সালে। সার্বভৌম ঋণসংকটের কারণে গ্রিক ব্যাংকগুলোর প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ইউরো ক্ষতি হয়েছিল এবং সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল।
পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সংস্কার ও খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মূলধনভিত্তি শক্তিশালী, তারল্য পরিস্থিতি উন্নত এবং চাপ-পরীক্ষায় তাদের সক্ষমতা সন্তোষজনক। গ্রিসের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হারও এখন ইউরো এলাকার গড় পর্যায়ের কাছাকাছি।
বেসরকারি ঋণ ও নতুন ঝুঁকি
ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু বলেন, ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কমলেও বেসরকারি খাতের ঋণ সমস্যা পুরোপুরি দূর হয়নি। ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঋণের বোঝা এখনো অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় গ্রিসের অর্থ মন্ত্রণালয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় দেউলিয়াত্ব কাঠামো সংস্কারের একটি খসড়া আইন উপস্থাপন করেছে। এতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, ঋণসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তদারকি ও জবাবদিহি বাড়ানোর বিষয় রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, মূল্যস্ফীতি, এআই, সাইবার হামলা ও জলবায়ু পরিবর্তন আর্থিক খাতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি গ্রিসের পর্যটন, নৌপরিবহন ও বাণিজ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় নীতি ও তদারকি কাঠামো প্রস্তুত রাখা জরুরি।
আন্তসংযোগ ও নিয়মিত মূল্যায়নে গুরুত্ব
মিকায়েল উরবানভা বলেন, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক বাজারের অবকাঠামোর মধ্যে আন্তসংযোগ বাড়ায় এক খাতের ঝুঁকি অন্য খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই সরকারি ঋণ, তারল্যঝুঁকি, ঋণনির্ভর বিনিয়োগ এবং ব্যাংক, বিমা ও পেনশন তহবিলের পারস্পরিক সম্পর্ক মূল্যায়নে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ক্রিস্টিনা পাপাকনস্টান্টিনু বলেন, নির্দিষ্ট সময় পরপর মূল্যায়ন হলে সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি যাচাই করা সহজ হয়। ঝুঁকিভিত্তিক পদ্ধতি দেশগুলোকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ দেবে। বিশেষ করে ক্রিপ্টো সম্পদ ও এআইয়ের মতো পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে আইএমএফের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেশগুলোর কাজে আসবে। নিয়মিত পর্যালোচনা ও আর্টিকেল ফোর পরামর্শের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবর্তনও আনা সম্ভব হবে।
কেকে/সাশ