সংসদে বিরোধী জোট জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। জামায়াতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্যে সমালোচনা করছেন এনসিপির শীর্ষ নেতারা। জোটের সর্বশেষ লংমার্চেও দলটির নেতাদের প্রত্যাশিত উপস্থিতি দেখা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, দুই দলের এই দূরত্ব কি জোটে ভাঙনের ইঙ্গিত, নাকি আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপির রাজনৈতিক কৌশল? আবার কেউ কেউ মনে করছেন, দুই দলের মধ্যে মতপার্থক্য বাড়লেও তা জোট ভাঙার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বরং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসন সমঝোতায় বাড়তি সুবিধা আদায় করতেই এনসিপি এমন অবস্থান নিয়েছে।
সূত্র বলছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আসন সমঝোতাকে কেন্দ্র করেই দুই দলের মধ্যে দূরত্বের সূত্রপাত। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ঢাকার দুই সিটির অন্তত একটিতে প্রার্থী দিতে চেয়েছিল এনসিপি। পাশাপাশি আরও তিনটি সিটিতে ছাড় দাবি করে দলটি। তবে ঢাকার কোনো সিটিতে ছাড় দিতে রাজি হয়নি জামায়াত। বিকল্প হিসেবে কুমিল্লা ও ময়মনসিংহে ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব দেয় দলটি। কিন্তু তাতে রাজি হয়নি এনসিপি। একপর্যায়ে দুই দলের মধ্যে সমঝোতার আলোচনা ভেস্তে যায়।
এরপর ঢাকার দুই সিটিতেই নিজস্ব প্রার্থী ঘোষণা করে এনসিপি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী করেছে দলটি। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ অক্টোবর এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে এককভাবে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি জোটের কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।
দুই দলের দূরত্বের আরেকটি লক্ষণ দেখা যায় গত ৩১ অক্টোবরের লংমার্চে। ১১ দলীয় জোটের এ কর্মসূচিতে অংশ নেননি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। উদ্বোধনী সমাবেশে উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য দেননি এনসিপির অন্য নেতারাও। এর আগে অনুষ্ঠিত দুটি লংমার্চে দলটির শীর্ষ নেতাদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেলেও এবার ছিল ভিন্ন চিত্র। অবশ্য পরে এনসিপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা লংমার্চে যোগ দেন।
গত ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীর পরাজয় নিয়েও দুই দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগে জামায়াতের জোরালো প্রতিবাদ না করা এবং বিজয়ী প্রার্থীর সঙ্গে পরাজিত প্রার্থীর সৌজন্য বিনিময়ের ঘটনাকে ভালোভাবে নেননি এনসিপির নেতারা। পরদিন ৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভ কর্মসূচিতে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। একই বিষয়ে জামায়াতের প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ।
তবে এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যে জোট নিয়ে কোনো দূরত্ব নেই বলে জানিয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক রাফিদ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘এনসিপির নিজস্ব রাজনীতি আছে, জামায়াতেরও নিজস্ব রাজনীতি আছে। কিছু বিষয়ে দুই দলের মত মিলবে, আবার কিছু বিষয়ে অমিল থাকবে। এটিকে দূরত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আপাতত জোট ছাড়া বা জোট ভেঙে যাওয়ার কোনো আলোচনা নেই।’
সর্বশেষ লংমার্চে এনসিপির প্রত্যাশিত উপস্থিতি না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এর সঙ্গে জোটের দূরত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। লংমার্চের আগের দিন এনসিপির নিজস্ব কর্মসূচি ছিল। পরের দিন যুবশক্তির জাতীয় যুবসমাবেশ ছিল। এ ছাড়া দলটির আরও কিছু কর্মসূচি রয়েছে। সব মিলিয়ে নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক কাজে ব্যস্ত থাকায় লংমার্চে অংশ নেওয়া কঠিন হয়েছে। তবে হাসনাত আবদুল্লাহসহ একাধিক নেতা লংমার্চে অংশ নিয়েছেন।
জামায়াতের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে এনসিপি নেতাদের সমালোচনার বিষয়ে রাফিদ ভূঁইয়া বলেন, জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যেও এসব বিষয়ে অসন্তোষ রয়েছে। এনসিপির নেতারা যৌক্তিক সমালোচনা করছেন। ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে প্রশ্ন উঠলে যেন এনসিপিকে জবাবদিহি করতে না হয়, সে কারণেই এখন থেকেই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে দূরত্ব তৈরির বিষয়টিও নাকচ করেন তিনি। রাফিদ ভূঁইয়া বলেন, এনসিপি এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্থানীয় নির্বাচন দল গোছানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিজেদের প্রস্তুতি অনুযায়ী এগোচ্ছে দলটি। নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিলে অন্য দলগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদ্ব›দ্বী হবে। এটিকে জোটের দূরত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ মনে করেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আলাদাভাবে করলেও জোটে কোনো সমস্যা হবে না।
এদিকে, জামায়াত জোট ছাড়লে এনসিপি তিন খণ্ডে বিভক্ত হবে বলে মন্তব্য করেছেন গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। আবু হানিফ তার পোস্টে বলেন, ‘এনসিপি জামায়াত জোট ছাড়ছে এমন কিছু সংবাদ দেখা যাচ্ছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। জামায়াত ছাড়া এনসিপি রাজনৈতিকভাবে নিঃস্ব বলা যায়। জোট ছাড়ার আওয়াজটা মূলত এনসিপির একটা কৌশল।
সামনে স্থানীয় নির্বাচন, সেই নির্বাচনে জামায়াতের কাছ থেকে বেশি সুবিধা নিতে মূলত জোট ছাড়ার ফাঁকা আওয়াজ দিচ্ছে। এ আওয়াজ দিলে জামায়াত এনসিপিকে স্থানীয় নির্বাচনে বেশি সুবিধা দিয়ে হলেও তাদের রাখবে। এনসিপি মূলত সেই সুযোগটার জন্যই জোট ছাড়ার কথা বলছে।
যদিও এনসিপি জামায়াতকে ছাড়তে পারবে না, তার দুইটা কারণ। প্রথমত, জোট ছাড়লে এনসিপি তিন খণ্ডে বিভক্ত হবে। এক খণ্ড সাবেক শিবির, এক খণ্ড সাবেক পরিষদ আরেক খণ্ড সাধারণ যারা।’ আবু হানিফ আরও বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, তৃণমূলে আসলে এনসিপি বলতে কিছু নাই, যাহা জামায়াত তাহাই এনসিপি। ফলে এই বাস্তবতায় জামায়াত জোট কখনোই ছাড়তে পারবে না এনসিপি।’
কেকে/সাশ