ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, বকেয়া বেতন পরিশোধ, বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুতি ও শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধসহ পাঁচ দফা দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প।
গতকাল সোমবার (২ নভেম্বর) রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কার্যত অচল হয়ে পড়ে গুরুত্বপূর্ণ এ শিল্পাঞ্চল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করতে হয়। দিনভর আন্দোলনের জেরে অন্তত ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণে সরকার ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, সরকারের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে একটি স্বার্থান্বেষী মহল অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যেও পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষকদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে এসেছে।
পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার আন্দোলন ও উৎপাদন বন্ধের কারণে অন্তত ৬৯০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এতে ১৭ লাখের বেশি শ্রমিক কর্মহীন অবস্থায় পড়েছেন। এর মধ্যে গাজীপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৩৮২টি, সাভার-আশুলিয়া ও জিরাবো এলাকায় ২২৩টি এবং ঢাকার মিরপুরে ৬৫টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। নারায়ণগঞ্জে আরও প্রায় ২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধের খবর পাওয়া গেছে।
শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য গঠিত ছয় সদস্যের বোর্ডে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের প্রতিনিধি, সরকারপক্ষের প্রতিনিধি এবং একজন নিরপেক্ষ সদস্য রয়েছেন। সরকার ও মালিকপক্ষের বক্তব্য— উৎপাদন বন্ধ থাকলে রপ্তানি চালান, ক্রেতাদের অর্থ পরিশোধ এবং নতুন ক্রয়াদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তবে শ্রমিক প্রতিনিধিদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের মজুরি বঞ্চনা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বেআইনি চাকরিচ্যুতির অভিযোগের সমাধান না হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ জমেছে। শুধু মজুরি বোর্ড গঠন করলেই হবে না, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে কিছু শ্রমিক সংগঠনের নেতা আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশের আশঙ্কাও জানিয়েছেন।
দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এ খাতে কর্মরত রয়েছেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত বিদেশি ক্রেতাদের নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়। ফলে শ্রমিক অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। মালিকপক্ষ উৎপাদন অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিলেও শ্রমিকদের দাবি, ন্যায্য মজুরি ও কর্মক্ষেত্রে অধিকার নিশ্চিত না হলে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
মিরপুরে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস
রাজধানীর মিরপুর-১০, মিরপুর-২, মিরপুর-১৪ ও সেনপাড়া পর্বতা এলাকায় সোমবার সকাল থেকেই বিক্ষোভে নামেন পোশাক শ্রমিকেরা। বিভিন্ন গলি দিয়ে সড়কে নামার চেষ্টা করেন তারা। মিরপুর-১৪ থেকে মিরপুর-১০ অভিমুখে মিছিলের চেষ্টা পুলিশ আটকে দেয়। পরে সেনপাড়া পর্বতা ও মিরপুর-২-এর প্রশিকা মোড় এলাকায় শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়।
সকাল থেকে মিরপুর-২, মিরপুর-১১ ও রূপনগরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকেরা মিছিল নিয়ে মিরপুর-১০ গোলচত্বরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ বাধা দিলে মিছিলগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। মিরপুর স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকা থেকেও দুই দফায় গোলচত্বরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা। তবে উভয়বারই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার মুখে পড়েন তারা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সকাল থেকেই মিরপুর-১০ গোলচত্বরে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। সেখানে জলকামান ও প্রিজন ভ্যান রাখা হয়। পাশাপাশি মিরপুর-১১, ১৩ ও ১৪ নম্বর এলাকার পোশাক কারখানাগুলোর আশপাশে নজরদারি জোরদার করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম জানান, মিরপুর বিভাগের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের নামে কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সাভার-আশুলিয়ায় সংঘর্ষ, টিয়ারশেল ও অগ্নিসংযোগ; ২৬৪ কারখানায় ছুটি
সাভার, হেমায়েতপুর ও আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২৬৪টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের বিক্ষোভ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ, পুলিশের টিয়ারশেল ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় শিল্প পুলিশের এক কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। কবিরপুর এলাকায় নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক দুই দফা অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের নিশ্চিন্তপুর ও ঘোষবাগ এলাকাতেও সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পৃথক স্থানে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে আগুন দেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা।
সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুরে নিউএজ কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শেষে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে আশপাশের বিভিন্ন কারখানায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে কয়েকটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। এ সময় হা-মীম গ্রুপের সামনে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ।
এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। শ্রমিকদের ছোড়া ইটের আঘাতে শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহমেদ আহত হন।
অন্যদিকে, সকালে আশুলিয়ার জিরাবো থেকে কাঠগড়া সড়কের পাশে বেঙ্গল প্লাস্টিক কারখানার সামনে প্রায় ৫০০ শ্রমিক বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে তারা কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন এবং অন্য শ্রমিকদের কারখানা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। পরে জিরাবো-কাঠগড়া সড়কের পাশের বিভিন্ন কারখানার সামনেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
সকালে নিট এশিয়া কারখানা বন্ধ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শারমিন গ্রুপের সামনে শ্রমিকেরা জড়ো হন। পরে বেলা সাড়ে ১১টার পর তারা আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে অবস্থান নেন। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধের পর পুলিশের হস্তক্ষেপে শ্রমিকেরা সড়ক ছেড়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের গাড়িতে আগুন
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর ও আশপাশের এলাকায় ৩৮২টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। সোমবার দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের মধ্যে এ অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি কারখানায় উৎপাদন বন্ধের তথ্য পাওয়া গেছে। বিভিন্ন শিল্প এলাকায় শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন।
সকাল ৭টা থেকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকেরা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। পরে সফিপুর বাজার, মৌচাক ও তেলিচালা এলাকাতেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এতে মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত যানজটের সৃষ্টি হয়।
বেলা ১১টার দিকে পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। দুপুরের দিকে নাওজোর এলাকায় পুলিশের একটি পিকআপে আগুন দেওয়া হয়। সফিপুরেও আরেকটি পিকআপে আগুন দেওয়া হয়। সংঘর্ষে বিজিবির এক সদস্য আহত হন।
এ সময় একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদক ও ক্যামেরা অপারেটর হামলার শিকার হন। তাদের ক্যামেরাও ভাঙচুর করা হয়। এর আগে কয়েকজন সাংবাদিককে মারধর এবং তাদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গাজীপুরে বিজিবির ১০ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়। শিল্প পুলিশের হিসাবে, এ অঞ্চলে প্রায় ১৫০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল।
নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট এলাকায় সড়ক অবরোধ
সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফতুল্লার শিবু মার্কেট, কাঠেরপুলসহ বিভিন্ন এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা মিছিল নিয়ে শিবু মার্কেট এলাকায় জড়ো হন। একপর্যায়ে তারা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের উভয় পাশে অবস্থান নিয়ে ওভারপাসসহ সড়কের দুই পাশের যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এ সময় ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেয় শ্রমিকেরা।
অবরোধের কারণে লিংক রোডের প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন পথচারী ও বাসযাত্রীরা। অনেক যাত্রীকে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গার্মেন্ট থেকে শ্রমিকদের বের করে নেওয়াকে কেন্দ্র করে ভুইগড় এলাকায় একটি কারখানায় শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এর পরপরই বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকেরা একত্রিত হয়ে শিবু মার্কেট এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। মজুরি বোর্ড গঠনের পর এ ধরনের আন্দোলন হওয়ার কথা নয়। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে শ্রমিক বিক্ষোভ হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল এখানে উসকানি দিচ্ছে। এটা বরদাশত করা হবে না। আমরা সাধারণ শ্রমিকদের পাশে আছি। সরকার তাদের বিষয়টি দেখবে।’
কেকে/সাশ