যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি নিয়ে নজরদারি ও সমালোচনার সুযোগ পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। তবে ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক প্রত্যাহার কিংবা নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত করতে চাইলেও বড় ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হবে দলটিকে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বাণিজ্য ও আইন বিশেষজ্ঞরা এ বিশ্লেষণ দিয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অর্থায়ন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে ছাড় আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটদের। তবে নির্বাচনের ফলাফলের কারণে শিগগিরই ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে—এমন প্রত্যাশা করছেন না বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা।
আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ংয়ের ওয়াশিংটন কাউন্সিল কার্যালয়ের বাণিজ্যনীতি বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্লেক হার্ডেন বলেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেও ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি ও কার্যকর শুল্ক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, বাণিজ্যসংক্রান্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা আগেই কংগ্রেস থেকে নির্বাহী বিভাগের হাতে দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেমোক্র্যাটদের প্রধান মনোযোগ থাকবে বাণিজ্যবিষয়ক কমিটিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তদন্ত, শুনানি ও নজরদারি কার্যক্রমে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক অব্যাহতি দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় কোম্পানিগুলোর প্রভাব এবং এসব শুল্কের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষতির বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আসতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের শুল্ক আরোপে ব্যবহৃত কিছু পুরোনো বাণিজ্য আইন বাতিলের আগ্রহও দেখিয়েছেন। এর মধ্যে ১৯৩০ সালের ট্যারিফ আইনের ৩৩৮ ধারা রয়েছে। প্রায় এক শতাব্দী পুরোনো এই ধারা ব্যবহার করে কানাডা থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
রয়টার্সের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে অন্তত ২৩৫টি আসন পেতে পারে ডেমোক্র্যাটরা। অন্যদিকে সিনেটে তাদের আসনসংখ্যা ৫৪-তে দাঁড়াতে পারে। মিসিসিপি ও আলাস্কার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে আরও দুটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সিনেটে কোনো বিল পাস করতে ফিলিবাস্টার বাধা অতিক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় ৬০ ভোট নিশ্চিত করতে রিপাবলিকানদের সমর্থন লাগবে।
এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের ভেটো অগ্রাহ্য করতে প্রতিনিধি পরিষদে ২৯০ এবং সিনেটে ৬৭ ভোট প্রয়োজন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও এককভাবে ট্রাম্পের ভেটো অকার্যকর করার মতো অবস্থানে নেই ডেমোক্র্যাটরা।
তবে বাইডেন প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয়ের সাবেক আইন উপদেষ্টা গ্রেটা পেইশ মনে করেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার সমর্থন পাওয়া গেলে ভেটো অগ্রাহ্য করার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যদিও তিনি স্বীকার করেছেন, এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া কঠিন।
শুল্কের কারণে বাড়ছে ব্যয়ের চাপ
প্রতিনিধি পরিষদের ওয়েজ অ্যান্ড মিনস কমিটির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ডেমোক্র্যাট নেতা রিচার্ড নিল জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে দলটি নীতিগত কর্মসূচি তৈরি করবে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বাণিজ্যবিষয়ক উপদেষ্টা উইলিয়াম রেইনশের মতে, শুল্কের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোর ক্ষতি এবং বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শুল্ক ছাড় দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে শুনানি করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে ডেমোক্র্যাটদের। তবে ট্রাম্পের শুল্কনীতির নেতিবাচক দিকগুলো মোকাবিলা করতে চাইলেও বিকল্প কোনো সুসংগঠিত বাণিজ্যনীতি নিয়ে দলটির মধ্যে এখনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি।
অন্যদিকে, সব শুল্ক প্রত্যাহার করাও ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য নাও হতে পারে। কারণ, ঐতিহাসিকভাবে দলটি গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় শিল্প সুরক্ষায় শুল্ক আরোপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন চীনা পণ্যের ওপর ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের অধিকাংশ শুল্ক বহাল রাখার পাশাপাশি বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্কসহ কৌশলগত বিভিন্ন পণ্যে নতুন শুল্ক আরোপ করেছিলেন।
নতুন শুল্ক আরোপে অনড় ট্রাম্প
নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পকে নতুন শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা থেকে সরিয়ে দেবে বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান তদন্তের আওতায় চীন, ভারত, ভিয়েতনামসহ আরও এক ডজনের বেশি বাণিজ্য অংশীদারের পণ্যে নতুন শুল্ক আরোপের সুযোগ রয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা কেলি অ্যান শ বলেন, ট্রাম্প কয়েক দশক ধরেই শুল্কনীতির পক্ষে এবং বাণিজ্য অংশীদারদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ে এটিকে কার্যকর হাতিয়ার মনে করেন। তাই নির্বাচনের ফলাফলের কারণে তিনি শুল্ক আরোপের উদ্যোগ থেকে সরে আসবেন বলে মনে হয় না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় নির্বাচনের ফলাফল কানাডার অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনবে না বলে জানিয়েছেন দেশটির বাণিজ্যমন্ত্রী ডমিনিক লেব্ল্যাঙ্ক। বুধবার তিনি জানান, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখবে অটোয়া।
সূত্র: রয়টার্স
কেকে/সাশ