বাংলাদেশে সয়াবিন উৎপাদন টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল করতে গবেষণা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (গাকৃবি) ও জাপানের আন্তর্জাতিক কৃষিবিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র (জিরকাস)। রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন এবং পরিবেশবান্ধব রোগ ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি নিয়ে যৌথভাবে কাজ করবে প্রতিষ্ঠান দুটি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয়ে আয়োজিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে গাকৃবির উপাচার্য প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান এবং জিরকাসের প্রোগ্রাম পরিচালক ড. কেইসুকে ওমোরি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
সংশ্লিষ্টদের আশা, এ উদ্যোগ দেশের খাদ্য ও প্রাণিখাদ্য নিরাপত্তা জোরদার এবং সয়াবিন আমদানিনির্ভরতা কমাতে ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে জিরকাসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. ইয়ামানাকা নাওকি ও ড. সাসাকি কাজুহিরো, গাকৃবির পরিচালক (গবেষণা) প্রফেসর ড. মো. মসিউল ইসলাম, প্রকল্পের প্রধান গবেষক প্রফেসর ড. মো. মোতাহের হোসেন, পরিচালক (আইকিউসি) প্রফেসর ড. নাসরীন আক্তার আইভী এবং জেনেটিক্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট ব্রিডিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. লিয়াকত আলী উপস্থিত ছিলেন।
দুই প্রতিষ্ঠানের এক দশকেরও বেশি সময়ের গবেষণা সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গবেষণার মূল লক্ষ্য রোগ প্রতিরোধী সয়াবিনের জাত উদ্ভাবন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ছত্রাকনাশক ব্যবহারের সমন্বয়ে পরিবেশবান্ধব রোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গড়ে তোলা।
চুক্তি স্বাক্ষর বিষয়ে গাকৃবির উপাচার্য প্রফেসর ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সয়াবিন প্রোটিনের অন্যতম সমৃদ্ধ উৎস, যা মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণ এবং প্রাণিখাদ্য উৎপাদনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ক্রমবর্ধমান প্রোটিনের চাহিদা পূরণে সয়াবিন উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমদানিনির্ভরতা কমানো এখন সময়ের দাবি। জিরকাসের সঙ্গে এ গবেষণা সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের উপযোগী রোগ প্রতিরোধী জাত ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী। এর সুফল কৃষকের উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধি থেকে শুরু করে দেশের পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারেও অবদান রাখবে।’
চুক্তি-পরবর্তী আলোচনায় এশিয়ান সয়াবিন রাস্ট ও সারকোস্পোরা লিফ ব্লাইট রোগের বিস্তার, রোগজীবাণুর বৈশিষ্ট্য, ছত্রাকনাশকের প্রতি প্রতিরোধক্ষমতা এবং কৃষকদের প্রচলিত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এসব গবেষণার মাধ্যমে রোগের প্রকৃতি ও বিস্তার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা অর্জনের পাশাপাশি কার্যকর রোগ ব্যবস্থাপনার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি হবে।
গবেষণার আওতায় জিরকাস ও দক্ষিণ আমেরিকার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্ভাবিত জিনগতভাবে পরিবর্তিত নয়—এমন (নন-জিএম) রোগ প্রতিরোধী সয়াবিনের জাত বাংলাদেশের পরিবেশে মাঠপর্যায়ে মূল্যায়ন করা হবে। একই সঙ্গে এসব জাতের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা, স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজন এবং বাণিজ্যিক নিবন্ধনের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে।
বাংলাদেশের কৃষি-পরিবেশের উপযোগী জাত পাওয়া না গেলে নতুন রোগ প্রতিরোধী সয়াবিনের জাত উদ্ভাবনে প্রজনন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি সমন্বিত রোগ ব্যবস্থাপনার অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুফল মূল্যায়নের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও রোগজনিত ক্ষতি কমানোর কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করা হবে।
গাকৃবির কৃষিতত্ত্ব বিভাগ ইতোমধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সয়াবিনের ছয়টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাত বর্তমানে নোয়াখালী, ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের চরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রায় ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছেন, গবেষণা অংশীদারত্বের এ নতুন অধ্যায় জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও জাপানের কৃষি অর্থনীতির জন্য কার্যকর, টেকসই ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান তৈরিতে অবদান রাখবে।
কেকে/এমএস