গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেশের আলেম সমাজ। এ নিয়ে প্রতিবাদ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের অন্যতম প্রধান ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। একইসঙ্গে সরকারকে এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
একই দাবি জানিয়েছেন সুফিবাদে বিশ্বাসী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের শীর্ষ কয়েকজন নেতা।
গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রচার সম্পাদক মুফতি কিফায়াতুল্লাহ আজহারীর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলা হয়, বঙ্গভবনে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়ানো হয়েছে। দেশের আলেম-উলামা ও তাওহিদি জনতার পক্ষে আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
এতে আরও বলা হয়, শামীম কায়সার লিংকনকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান আলেম সমাজ ও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। তিনি দেশের প্রচলিত পীর-মাশায়েখ, তাবলিগ জামাত এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত চার মাজহাবের চেতনাবিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসী।
ধর্ম মন্ত্রণালয় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিশেষায়িত ক্ষেত্র উল্লেখ করে এ বিবৃতিতে বলা হয়, এ পদে ইসলামী মূল্যবোধে শ্রদ্ধাশীল ও উলামায়ে কেরামের কাছে গ্রহণযোগ্য কাউকে দায়িত্ব না দিয়ে এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ দেশের ধর্মপ্রাণ জনগণের অনুভূতিতে আঘাত হানবে।
বিবৃতিতে সরকারকে ‘সতর্ক করে’ আরও বলা হয়, দেশের কওমি আলেম সমাজ ও তাওহিদি জনতার অকৃত্রিম অবদান ও পরামর্শকে উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে উলামায়ে কেরামের সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক ও আস্থায় চরম চিড় ধরবে।
অতএব, সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় ঘটিয়ে শামীম কায়সার লিংকনকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করার জোর দাবি জানানো হচ্ছে। একইসঙ্গে আলেম-উলামাদের সাথে পরামর্শক্রমে একজন যোগ্য, অভিজ্ঞ এবং সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদানের জন্য আহ্বান জানানো হয়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান খোলা কাগজকে বলেন, “দেশের ৯৮ শতাংশ আলেম-ওলামা ও তৌহিদি জনতা হানাফি মাজহাব অনুসরণ করেন। তাই ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মতো স্পর্শকাতর দায়িত্বে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মতাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাউকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত।”
ধর্ম প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের আগে এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কোনো আলোচনা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে সাজিদুর রহমান বলেন, “নতুন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়ে হেফাজতের পক্ষ থেকে আগেই সরকারের সংশ্লিষ্টদের কাছে একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রস্তাব উপেক্ষা করা হয়েছে। তবে সরকার চাইলে এখনো এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে পরামর্শ হতে পারে।”
একই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের (বেফাক) মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক খোলা কাগজকে বলেন, “এ আপত্তির পেছনে ব্যক্তিগত আক্রোশ বা বিরোধ নেই। বরং দেশের বর্তমান ধর্মীয় পরিবেশ ও পারস্পরিক সম্প্রীতি যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই চিন্তা থেকেই সরকারকে সতর্ক করা।”
দেশের অধিকাংশ মানুষ হানাফি মতাদর্শ অনুসরণ করেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দেশের ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে এমন একজন ব্যক্তি যদি এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আসেন, যার ধর্মীয় মতাদর্শ নিয়ে একটি বড় অংশের আপত্তি রয়েছে; তখন স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তবে তাকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হলে কোনো আপত্তি থাকবে না।”
তবে ধর্মপ্রতিমন্ত্রীর ইস্যুকে সামনে এনে এখনই কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী। তিনি খোলা কাগজকে বলেন, “উনি একজন শিক্ষিত মানুষ। উনার ব্যক্তিগত ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে আমাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকতে পারে। উনি আহলে হাদিসের ধারণা ধারণ করে চলেন। এ কারণে হয়তো আমাদের মনে হচ্ছে, ধর্ম মন্ত্রণালয়ে উনার কারণে ক্ষতি হতে পারে। তবে আমি মনে করি, একজন প্রজাতন্ত্রের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী হিসেবে উনি যদি সংবিধানের মধ্যে থেকে উনার যাবতীয় দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে আসলে কারও কোনো আপত্তি থাকবে না।”
তিনি আরও বলেন, “উনি মাত্র দায়িত্ব পেয়েছেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর পরবর্তী সময়ে উনার কর্মকাণ্ডের ওপর কথা বলার সুযোগ থাকবে। সুতরাং এখনই তাকে বাধাগ্রস্ত করতে চাই না।”
এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমেদ খোলা কাগজকে বলেন, “আসলে উনি (ধর্ম প্রতিমন্ত্রী) বোধ হয় আহলে হাদিসের অনুসারী। এদিকে আমাদের দেশে প্রচলিত চারটি মাজহাবের মধ্যে অধিকাংশ মানুষই হানাফি মাজহাব অনুসরণ করেন। যার ফলে উনার ধর্মীয় চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের সঙ্গে দেশের অধিকাংশ মানুষের, বিশেষ করে হানাফি মাজহাবের অনুসারীদের কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। এ ছাড়া উনি যদি অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতেন, হয়তো এ নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা বা উদ্বেগ তৈরি হতো না। যেহেতু উনার সঙ্গে দূরত্বটা মূলত ধর্মীয় বিষয়কে কেন্দ্র করে, তাই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকার চাইলে এ বিষয়টি আরও গুরুত্বসহকারে চিন্তা করলেও পারত।”
অন্যদিকে হেফাজতের বাইরে সুফিবাদী সংগঠন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনকে নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। চট্টগ্রামে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা ও ইসলামী বক্তা মুফতি গিয়াস উদ্দিন আত্ব-তাহেরী এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, “আহলে হাদিস একটি কট্টর সংগঠন। তারা নিজেদের সবচেয়ে সঠিক হিসেবে দাবি করে থাকে। আর শামীম কায়সার লিংকনও সেই মতাদর্শে বিশ্বাসী। আমরা মনে করি, এ ধরনের লোক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলে ধর্মের সুমহান আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
এসব বিষয়ে জানতে নতুন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
কেকে/সাশ