রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬,
৮ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: নৌ ও বিমানবাহিনী নির্বাচনি পর্ষদ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী      তরুণদের প্রশিক্ষণ দিতে ৬৮৩ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প সরকারের      প্রতিবেশী দেশগুলোকে ইরানের হুঁশিয়ারি      সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের দ্রুত গ্রেপ্তারের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর      হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু      রাষ্ট্রপতির শপথ-দায়িত্বভার গ্রহণের প্রজ্ঞাপন জারি      নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুলকে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট: কারণ, প্রভাব ও উত্তরণের পথ
প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন মিলন
প্রকাশ: রোববার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪১ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি; বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা, সমন্বয়হীন উন্নয়ন, আর্থিক চাপ এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার সম্মিলিত ফল আজ দৃশ্যমান।

গত প্রায় ১৭ বছরে দেশে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে কুইক রেন্টালসহ বিভিন্ন ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্যাস, কয়লা, এলএনজি, পাইপলাইন, বন্দর, অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধা এবং নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়নি। ফলে দেশে বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিপুল আর্থিক দায় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের সরবরাহকারীদের কাছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা এবং বিভিন্ন পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানির ব্যাংকঋণ প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ ধরনের আর্থিক চাপ পুরো খাতের স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে।

অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন—দুই বছর আগেও তো দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির এমন সংকট ছিল না। বাস্তবতা হলো, সংকটটি তখনও ছিল। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটার পর দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ও আর্থিক সমস্যাগুলো প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের অর্থনীতিও নতুন করে বিবেচনা করা জরুরি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যদি ৩১ টাকা ব্যয়ে এক ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা ৭ টাকায় বিক্রি করতে হয়, তাহলে বিপুল ভর্তুকির প্রয়োজন হয়। জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া অবশ্যই সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেশি রেখে দীর্ঘমেয়াদে ভর্তুকিনির্ভর ব্যবস্থা চালিয়ে যাওয়া অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। তাই সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

আজ দেশে স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি হলেও সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। বাস্তবে জ্বালানি ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন অনেক সময় ১৪ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে নেমে আসে। ফলে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হলে লোডশেডিং বাড়ে এবং জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং কর্মসংস্থানে। উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে যায়; উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

উত্তরণের জন্য যা জরুরি

প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য একটি শক্তিশালী Central Energy Command & Integrated Planning System গঠন করতে হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি আমদানি ও দেশীয় উৎপাদন, পাইপলাইন, এলএনজি টার্মিনাল, বন্দর, পরিবহন, সঞ্চালন ও বিতরণ—সবকিছুকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জনগণের কাছে সংকটের প্রকৃত কারণ, সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ এবং সংকট মোকাবিলার অগ্রগতি নিয়মিতভাবে প্রকাশ করতে হবে। অন্তত সপ্তাহে একবার একটি নির্ভরযোগ্য Energy Crisis Update দেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করা জরুরি।

তৃতীয়ত, এই মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয় নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিবর্তে বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ দক্ষতায় চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। যেসব কেন্দ্র জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ বা অন্য কোনো কারণে বন্ধ রয়েছে, সেগুলোর কারণ নির্ধারণ করে দ্রুত সমাধান করতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

চতুর্থত, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি স্থাপনায় দ্রুত Rooftop Solar + Battery Energy Storage System (BESS) স্থাপন করা যেতে পারে। এটি দিনের পিক চাহিদা কমানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সহায়তা করবে।

পঞ্চমত, দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লা সম্পদের অনুসন্ধান ও উত্তোলনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমদানিনির্ভরতার পাশাপাশি দেশীয় জ্বালানি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

ষষ্ঠত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, প্রতিযোগিতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন এবং Integrated Resource Planning বাধ্যতামূলক করা দরকার।

বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সংকট নয়; এটি অর্থনীতি, শিল্প, কর্মসংস্থান এবং মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি জাতীয় সংকট। তাই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ‘Power Plant First’ নয়, বরং ‘Energy Security First’ নীতিতে এগোতে হবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য সাশ্রয়ী জ্বালানি, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা, পর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং টেকসই আর্থিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। সমন্বিত পরিকল্পনা ও সাহসী সংস্কারের মাধ্যমে এখনো এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  বিদ্যুৎ ও জ্বালানি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close