প্লাস্টিক ও কাগজের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিকল্প তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে ‘প্রজেক্ট সুখল’। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) চার শিক্ষার্থী ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) এক শিক্ষার্থীর সম্মিলিত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্ভাবন সুপারি পাতার খোল থেকে তৈরি পরিবেশবান্ধব অনটাইম বা ইভেন্ট আইডি কার্ড।
সহজলভ্য ও ব্যবহারের পর পড়ে থাকা সুপারি পাতার খোলকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে এসব আইডি কার্ড। প্রচলিত প্লাস্টিক ও কাগজের পরিবর্তে প্রাকৃতিক এই উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে বর্জ্য কমানোর পাশাপাশি স্থানীয় সম্পদকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
‘আমরা নতুন নেটওয়ার্ক’ (এএনএন)-এর একটি প্রকল্প হিসেবে প্রজেক্ট সুখলের যাত্রা শুরু। শুরু থেকেই পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমানো এবং স্থানীয় ও সহজলভ্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহারযোগ্য পরিবেশবান্ধব পণ্য তৈরি প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।
এই লক্ষ্য থেকেই সুপারি পাতার খোল কাজে লাগিয়ে অনটাইম বা ইভেন্ট আইডি কার্ড তৈরির উদ্যোগ নেন প্রকল্পটির তরুণ সদস্যরা। সাধারণত বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেমিনার, সম্মেলন ও কর্মশালায় ব্যবহৃত আইডি কার্ডে প্লাস্টিক ও কাগজ ব্যবহার করা হয়। অনুষ্ঠান শেষে এসব কার্ডের বড় একটি অংশ বর্জ্যে পরিণত হয়। এর বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক উপাদাননির্ভর এই আইডি কার্ড তৈরি করেছে প্রজেক্ট সুখল।
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় সুপারি গাছের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। সুপারি ব্যবহারের পর পাতার খোল অনেক সময় বর্জ্য হিসেবে পড়ে থাকে। সেই অব্যবহৃত উপাদানকে নতুনভাবে কাজে লাগিয়ে পণ্য তৈরির মাধ্যমে ‘বর্জ্য নয়, সম্পদ’ ধারণাটিকে বাস্তবে প্রয়োগের চেষ্টা করেছে প্রকল্পটি।
সম্প্রতি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘ফার্স্ট ন্যাশনাল সাইন্স কনফারেন্স ২০২৬’-এ প্রজেক্ট সুখলের তৈরি পরিবেশবান্ধব আইডি কার্ডের ব্যবহার করা হয়। সম্মেলনের অংশগ্রহণকারী ও সংশ্লিষ্টদের জন্য এসব আইডি কার্ড দেওয়া হয়। পরিবেশবান্ধব উপাদান দিয়ে তৈরি ব্যতিক্রমী এই কার্ড শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গবেষক ও অতিথিদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করে এবং প্রশংসা কুড়ায়।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সাইন্স ক্লাবের সভাপতি নীতুন পাল বলেন, “আমাদের পুরো প্রোগ্রামটিকে পরিবেশবান্ধব রাখার ক্ষেত্রে প্রজেক্ট সুখল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। আমাদের আয়োজিত ফার্স্ট ন্যাশনাল সাইন্স কনফারেন্স ২০২৬-এর অংশগ্রহণকারী ও বিচারকমণ্ডলীর সদস্যরাও এই পরিবেশবান্ধব উদ্যোগটি অত্যন্ত পছন্দ করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে এ ধরনের পরিবেশবান্ধব পণ্য ও উদ্যোগকে আমাদের আরও উৎসাহিত করা উচিত। আমাদের ছোট ছোট উদ্যোগই একদিন একটি প্লাস্টিকমুক্ত ও টেকসই পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে, যা আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে চাই।”
প্রজেক্ট সুখলের কো-ফাউন্ডার আবদুল আল তামিম বলেন, “আমাদের এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শুধু একটি নতুন ধরনের আইডি কার্ড তৈরি করা নয়; বরং প্রতিদিনের ব্যবহারে পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহারের একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করা। সুপারি পাতার খোল আমাদের দেশে সহজলভ্য একটি প্রাকৃতিক উপাদান, যা ব্যবহারের পর অনেক সময় বর্জ্য হিসেবে পড়ে থাকে। আমরা সেই উপাদানকেই নতুনভাবে কাজে লাগিয়ে প্লাস্টিক ও কাগজের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারযোগ্য একটি পণ্য তৈরির চেষ্টা করেছি।”
প্রজেক্ট সুখলের সদস্যরা মনে করেন, পরিবেশবান্ধব উদ্ভাবনের জন্য সবসময় ব্যয়বহুল বা জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না। স্থানীয় সম্পদকে নতুনভাবে কাজে লাগানোর সৃজনশীল চিন্তা ও উদ্যোগের মাধ্যমেও কার্যকর সমাধান তৈরি করা সম্ভব। সুপারি পাতার খোল থেকে আইডি কার্ড তৈরির উদ্যোগ তারই একটি উদাহরণ।
একটি আইডি কার্ড দেখতে ছোট একটি উদ্ভাবন হলেও এর মাধ্যমে প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার এবং টেকসই জীবনযাপন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সম্মেলন ও প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের পরিবেশবান্ধব বিকল্পের ব্যবহার বাড়ানো গেলে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও কাগজের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুপারি পাতার খোলকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে না দিয়ে তা থেকে ব্যবহারযোগ্য পণ্য তৈরির এ উদ্যোগ শুধু একটি পরিবেশবান্ধব আইডি কার্ড উদ্ভাবনের গল্প নয়; বরং স্থানীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের সম্ভাবনাময় দৃষ্টান্ত।
কেকে/সাশ