কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাজী এম. আনিছুল ইসলামের বিরুদ্ধে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণ ও অ্যাকাডেমিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ নিয়ে ফের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভাগের সাবেক এক নারী শিক্ষার্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে এ সব অভিযোগ তুলে কাজী আনিছকে ‘শিক্ষক কম, মেয়েখোর বেশি’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার এমন বক্তব্যের পর শিক্ষক আনিছকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকালে দেওয়া ওই পোস্টে অভিযোগগুলো করেন বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের সাবেক শিক্ষার্থী আসমা ইসলাম।
বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত। পোস্টে তিনি দাবি করেন, শিক্ষকতার পরিসরের বাইরে নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি কাজী আনিছের বিশেষ আগ্রহ ছিল। তার ভাষ্য, ‘হাঁটুর বয়সী মেয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ে খেলাধুলা’ করেই তিনি শিক্ষকতার ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
আসমার অভিযোগ, বিভাগে ভালো ফলাফল করায় কাজী আনিছের প্রত্যাশা ছিল, তিনি তাকে সন্তুষ্ট রাখবেন। তবে তা না করায় বিভিন্ন সময় অপমানজনক আচরণের শিকার হন তিনি। একদিন চুলের ধরণ নিয়ে তাকে বলা হয়, ‘এই যে চুলের গেটআপ তোমার, এ গেটআপে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখো?’ তার দাবি, নিজের থিসিস জমা দেওয়ার মাত্র পাঁচদিন আগে কাজী আনিছ গবেষণার পুরো পদ্ধতি পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। অথচ তিনি ওই শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন না বলেও জানান।
সুপারিশপত্র না দেওয়ার ঘটনাও পোস্টে তুলে ধরেন আসমা। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য ২০২৪ সালের ৩১ জানুয়ারি সুপারিশপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল। এর আগে অনুমতি নিয়ে তিনি কাজী আনিছের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নিজের লেখা সুপারিশপত্রের খসড়াও ই-মেইল ও পরে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠান। নতুন নম্বরে পাঠাতে বলার পর সেখানেও পাঠানো হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি কোনো সুপারিশপত্র পাননি বলে দাবি করেন আসমা।
এ ঘটনার সঙ্গে কাজী আনিছের বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের প্রসঙ্গও টানেন তিনি। আসমার ভাষ্য, কোনো শিক্ষক অপছন্দের শিক্ষার্থীকে সুপারিশপত্র না-ও দিতে পারেন। কিন্তু তার কাছে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, একই শিক্ষক কীভাবে পরবর্তীতে অন্য এক নারী শিক্ষার্থীকে উত্তরসহ প্রশ্নপত্র দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন।
২০২৫ সালের মার্চে কাজী এম. আনিছুল ইসলামের বিরুদ্ধে এক নারী শিক্ষার্থীকে একাধিক পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহের অভিযোগ ওঠে। ই-মেইলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে অভিযোগটি পাঠানো হয়। এর সঙ্গে কয়েকটি পিডিএফ এবং সেগুলোর মেটাডাটার তথ্যও দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগের পর ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের তৃতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের একটি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত চলাকালে কাজী আনিছকে অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা এবং বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ অভিযোগের বিষয়ে সে সময় কাজী আনিছ জানিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানতে চাইলে তিনি বক্তব্য দেবেন। পরে অভিযোগ তদন্তে গঠিত দ্বিতীয় টেকনিক্যাল কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সৈয়দুর রহমান জানিয়েছেন, শনিবারের সিন্ডিকেট সভায় প্রতিবেদনটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
এ দিকে আসমার পোস্টে আরও কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থী তাদের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির সাবেক সভাপতি ফেরদৌস জান্নাত কাজী আনিছের সঙ্গে তার বিরোধের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে তার প্রথম যে শিক্ষকের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছিল, তিনি আনিছ। আরেক শিক্ষার্থী রূম্পা নন্দী অভিযোগ করেন, একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে না পারায় তাকে প্রায় দুই বছর বিভিন্নভাবে কথা শুনতে হয়েছে।’
নতুন অভিযোগের বিষয়ে কাজী এম. আনিছুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তার ভাই হৃদ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তিনি ভাইকে নিয়ে মেডিকেলে আছেন।’
পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন জানিয়ে ফোন রেখে দেন।
আসমা ইসলামের অভিযোগগুলোর স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তার পোস্টে ওঠা নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও অ্যাকাডেমিক সুবিধা-সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো তদন্তের আওতায় এসেছে কি না, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও তা নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এ সব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা রয়েছে।
কেকে/এআই