শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬,
৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ভারতজুড়ে পতাকা মিছিলের ডাক ককরোচ জনতা পার্টির      ● মনিরুল পরিবারের ৮৩ ব্যাংক হিসাবে ১৯ কোটি টাকা, সব ফ্রিজের আদেশ      ● হাম উপসর্গে একদিনে ৪ জনের প্রাণহানি      ● মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের ঘোষণা      ● ডেঙ্গুতে আরও ১০ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৪৩      ● আইএমএফের ঋণ পেতে শর্ত পূরণ করতে হবে: অর্থমন্ত্রী      ● জলবায়ু ও যুদ্ধের ধাক্কায় ঝুঁকিতে খাদ্য নিরাপত্তা       
খোলাকাগজ স্পেশাল
নিয়ন্ত্রণহীন বাজার, অসহায় মানুষ
শরীফ আহমেদ ইমন
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:১৬ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

নিত্যপণ্যের বাজারের থলে যেন দিন দিন ছোট হতে হতে আজ শূন্যের কোঠায় ঠেকেছে। মধ্যবিত্তের সঞ্চয় ভাঙছে, আর নিম্ন আয়ের মানুষের পাতে উঠছে না পুষ্টিকর খাবার। বাজার ব্যবস্থার এই লাগামহীন দৌড়ে কোণঠাসা হয়ে পড়া সাধারণ মানুষ আজ অসহায়ভাবে দেখছে কীভাবে তাদের ঘাম ঝরানো আয়ের সিংহভাগ গিলে খাচ্ছে চড়া বাজারদর— যাদের দেখার বা স্বস্তি দেওয়ার যেন কেউ নেই।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কিছুদিনের ব্যবধানে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে যে চরম বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম দেখা দিয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে বাজারজুড়ে এক ধরনের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যার সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ ও সীমিত আয়ের মানুষকে। চাল, ডাল, তেল, ডিম ও শাকসবজিসহ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি বৃদ্ধির পর পরিবহন খরচ সামান্য বাড়লেও খুচরা বাজারে পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হারে। অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ও ব্যবসায়ী চক্র সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভোক্তাদের পকেট কাটছে। 

পরিবহন ব্যয় সামান্য বাড়লে পণ্যের দামে কিছুটা প্রভাব পড়া স্বাভাবিক হলেও, কেজিপ্রতি এক-দুই টাকা খরচ বাড়ার অজুহাতে খুচরা পর্যায়ে ১০ থেকে ২০ টাকা দাম বাড়িয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ এক ধরনের কারসাজি। বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও যদি কৃত্রিম উপায়ে দাম বাড়ানো হয়, তবে বুঝতে হবে বাজার ব্যবস্থাপনার ভিত্তিমূলে বড় ধরনের গলদ রয়ে গেছে। 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মতো একাধিক সরকারি সংস্থা মাঠে থাকলেও তাদের কাজের সমন্বয়ের অভাব প্রকট। এর চেয়ে বড় সংকট হলো সংস্থাগুলোতে জনবলের তীব্র ঘাটতি। দুই কোটির এই মেগাসিটির বিশাল বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণে যে অপ্রতুল টিম মাঠে নামে, তা দিয়ে কার্যকর তদারকি করা মোটেও সম্ভব নয়। ফলে আইনের ফাঁক গলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সহজেই সুযোগ নিচ্ছে এবং প্রশাসনের নজরদারি অভিযানগুলোর সুফল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। 

অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কবজায় চালের বাজার: বাজার ব্যবস্থাপনায় নজরদারির অভাব আর আইনের ফাঁক গলে চালের বাজার এখন পুরোপুরি এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের মুঠোয় বন্দি। চালের দাম নির্ধারণে মিল মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কারসাজি নতুন কিছু না হলেও এবার এর মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। ফলস্বরূপ, সাধারণ ভোক্তার পকেট কেটে ফুলেফেঁপে উঠছে ওই চক্রের সিন্ধুক, আর নাভিশ্বাস উঠেছে খেটে খাওয়া মানুষের। 

সাধারণ মানুষের থলিতে টান ফেলে দেশের বাজারগুলোতে আবারও দফায় দফায় ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে প্রধান খাদ্যপণ্য চালের দাম। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জনপদে চালের এই লাগামহীন দামে কপালে হাত পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের। 

রাজধানীর কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরু চাল কেজিপ্রতি ৭৪-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও এর দাম ছিল ৭২ টাকা। মাঝারি মানের চালের দাম ৫৫-৬২ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৫৮-৬৫ টাকা। তবে মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত আছে, কেজি ৫০-৫৫ টাকা। 

এদিকে, এমন এক সময়ে চালের দাম বাড়ল, যখন দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, সেপ্টেম্বরে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এটি গত ১২ মাসে দাম বাড়ার গড় হার। বাজারের চিত্রের সঙ্গে মিল নেই সরকারি তথ্যের। 

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, গত এক সপ্তাহে কোনো ধরনের চালেরই দাম বাড়েনি। উল্টো সরু চালের দাম কেজি প্রতি ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। অবশ্য গত এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি মানের চালের দাম কেজি প্রতি ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে টিসিবির তথ্যে দেখা গেছে। 

টিসিবির বাজারতথ্য শাখার সহকারী পরিচালক শতদল মণ্ডল বলেন, ‘এ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী আমাদের হিসাব সঠিক বলেই মনে হচ্ছে। তবে বিষয়টি আমরা গরমিল খতিয়ে দেখব।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের বাজার জরিপ শুধু ঢাকায় সীমিত। এর মধ্যে আছে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, মালিবাগ, রামপুরা, মহাখালী ও পশ্চিম আগারগাঁও।’ তার ভাষ্য, টিসিবির তথ্য একটি পণ্যের ক্ষেত্রে মিলেছে, বাকি দুটির ক্ষেত্রে মেলেনি। 

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এ সময়ে মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫৫-৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। মান অনুযায়ী সরু চালের দাম ছিল ৭৫-৮৫ টাকা। 

সয়াবিন তেলের খুচরা বাজারে বিশৃঙ্খলা, অতিরিক্ত দাম আদায়: সরকার নির্ধারিত দাম ২০৪ টাকা হলেও অনেক খুচরা দোকানে এর চেয়ে বেশি দাম রাখার অভিযোগ অহরহ পাওয়া যায়। বিশেষ করে প্যাকেটভেদে কিংবা অজুহাত দেখিয়ে ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেল ও পাম তেলের ক্ষেত্রেও কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম মানা হচ্ছে না; বিক্রেতারা নিজেদের ইচ্ছেমতো দামে তা বিক্রি করছেন। 

তদারকিতে খামখেয়ালিপনা, লোক দেখানো অভিযান : রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের পক্ষ থেকে বাজার মনিটরিংয়ের ঘোষণা দেওয়া হলেও তার সুফল সাধারণ ভোক্তারা পাচ্ছেন না। অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে যে ধরনের কঠোর ও ধারাবাহিক অভিযান প্রয়োজন, বাস্তবে তার বড় অভাব রয়েছে। 

অভিযোগ রয়েছে, যখনই বাজারে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে এবং গণমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে, তখন দায়সারা গোছের কিছু নামমাত্র অভিযান চালিয়ে দায় সারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দুয়েকজন খুচরা বিক্রেতাকে সামান্য জরিমানা করেই শেষ হয় বড় বড় কর্তাব্যক্তিদের পরিদর্শন। কিন্তু যে সিন্ডিকেট বা পাইকারি বাজার থেকে কারসাজির শুরু, তাদের নাগাল পাওয়া যায় না বললেই চলে। 

ফলহীন অভিযানের পেছনে যত কারণ: বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণে অভিযানের কার্যকারিতা না থাকার পেছনে বেশ কিছু বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো— ১. সমন্বয়হীনতা: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর এবং সিটি করপোরেশনের মতো একাধিক সংস্থা মাঠে থাকলেও তাদের কাজের মধ্যে কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সমন্বয় নেই। 

২. জনবল সংকট: দুই কোটি মানুষের এই মেগাসিটির বিশাল বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণে যে পরিমাণ জনবল ও তদারকি টিম প্রয়োজন, বাস্তবে তার সিকিভাগও মাঠে থাকে না। ফলে একটি বাজারে অভিযান শেষ হতে না হতেই অন্য বাজারে পুরনো অনিয়ম শুরু হয়ে যায়। 

৩. তদন্ত ও শাস্তির দুর্বলতা: খুচরা দোকানদারদের সামান্য জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হলেও মূল হোতা বা মজুতদার সিন্ডিকেটের বড় ব্যবসায়ীরা রয়ে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে অভিযানের খবর পেলেই সাময়িক দাম কমিয়ে বা দোকান বন্ধ রেখে পার পেয়ে যায় অসাধু চক্র। 

ভোক্তাদের হতাশা, দিন দিন বাড়ছে ক্ষোভ: রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে বাজার করতে আসা সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বললে তাদের চোখে-মুখে হতাশার পাশাপাশি তীব্র অসন্তোষ লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে যদি প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপই না নিতে পারে, তবে মন্ত্রণালয় ও তদারকি সংস্থাগুলো কী করছে? 

মালিবাগ বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আরিফ হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রতিটি জিনিসের দাম আজ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। সরকারের মন্ত্রী-আমলারা বলেন বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে এবং মনিটরিং চলছে; কিন্তু আমরা বাজারে এসে তো তার ছিটেফোঁটাও দেখি না। সরকার যদি বাজার নিয়ন্ত্রণই করতে না পারে, তবে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়? সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার জায়গাটাই নড়ে গেছে।” 

একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন মোহাম্মদপুর এলাকার রিকশাচালক আব্দুল খালেক। তিনি বলেন, “চাল কিনতেই পকেট খালি হয়ে যায়, তেল-ডাল কিনব কীভাবে? সরকার নাকি কত অভিযান চালায়, জরিমানা করে—কিন্তু চালের দাম তো কমে না। গরিবের পেটে লাথি মেরে সিন্ডিকেটের কারসাজি যারা চালাচ্ছে, সরকার তাদের কেন আটকাতে পারে না?” 

বাজার বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের মতে, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের চরম ঘাটতি রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর কিংবা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে যে ঝটিকা অভিযান চালানো হয়, তা সাধারণ মানুষের কাছে এখন কেবলই ‘লোকদেখানো আইওয়াশ’ বা প্রহসন বলে মনে হচ্ছে। 

অভিযান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবসায়ীরা আগের মতো চড়া দামে পণ্য বিক্রি শুরু করেন। প্রশাসনের এই দুর্বল ও খামখেয়ালি ভূমিকা অসাধু সিন্ডিকেটকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। আর এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপে সাধারণ ভোক্তাদের ক্ষোভ সরাসরি গিয়ে পড়ছে সরকারের ওপর। 

বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর কোনো পরিবর্তন না এলে এই অসন্তোষ আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ মানুষের পকেট কাটা বন্ধ করে যদি দ্রুত সরবরাহ চেইনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে নিত্যপণ্যের বাজারের এই আগুন সাধারণ মানুষের মনে সরকারের প্রতি আস্থার সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে—এটাই এখন সবার বড় শঙ্কা।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  বাজার   অসহায় মানুষ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close