শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬,
৩১ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
শিরোনাম: ● ভারতজুড়ে পতাকা মিছিলের ডাক ককরোচ জনতা পার্টির      ● মনিরুল পরিবারের ৮৩ ব্যাংক হিসাবে ১৯ কোটি টাকা, সব ফ্রিজের আদেশ      ● হাম উপসর্গে একদিনে ৪ জনের প্রাণহানি      ● মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের ঘোষণা      ● ডেঙ্গুতে আরও ১০ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১৯৪৩      ● আইএমএফের ঋণ পেতে শর্ত পূরণ করতে হবে: অর্থমন্ত্রী      ● জলবায়ু ও যুদ্ধের ধাক্কায় ঝুঁকিতে খাদ্য নিরাপত্তা       
খোলাকাগজ স্পেশাল
অনিয়মে বাড়ছে অগ্নিকাণ্ড
রবিউল ইসলাম
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩০ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

অনিয়ম, গাফিলতি এবং আইন অমান্য করার কারণে দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। যথাযথ তদারকির অভাব, নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা বিধিমালা না মানার ফলে সামান্য অসতর্কতাও অনেক সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ে রূপ নিচ্ছে। নগরায়ন ও শিল্পায়ন প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে অগ্নি নিরাপত্তার বিষয়টিও চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে, যা একের পর এক বড় ধরনের জানমালের ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ২০২৫ সালেই সারা দেশে ২৭ হাজার ৫৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদিত নকশা পরিবর্তন করে ভবন নির্মাণ করা এবং জরুরি প্রস্থানের পথ বন্ধ বা সরু রাখার কারণে ছোট অগ্নিকাণ্ড বড় ঘটনায় রূপ নেয়। আবার আবাসিক হিসেবে অনুমোদন নিয়ে ভবনে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম, রেস্তোরাঁ বা কারখানা পরিচালনা করা হয়। 

সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ভবনগুলো নিয়মিত পরিদর্শন ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না। ফলে অগ্নিকাণ্ড বেড়েই চলেছে। তারপরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে না। বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তখন তারা নড়াচড়া শুরু করে। এরপর আর খবর থাকে না।

সরেজমিন দেখা যায়- আগুন লাগলে বের হওয়ার নিরাপদ পথ থাকে না। কার্যকর অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও থাকে না। পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ ও জরুরি আলোর ব্যবস্থাও অনুপস্থিত থাকে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সর্বশেষ অগ্নিনিরাপত্তা জরিপে পরিদর্শন করা ভবনের ৩৭ দশমিক ৩৮ শতাংশেই এমন ঘাটতি পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালে পরিদর্শন করা ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবনের মধ্যে ৩ হাজার ৯৩৮টিকে ঝুঁকিপূর্ণ বা অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। এক বছরের ব্যবধানে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের হার বেড়েছে। অন্যদিকে, পুরান ঢাকায় রাসায়নিকের গুদাম, প্লাস্টিক ও দাহ্য পদার্থের মজুত এবং সরু গলির কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

সর্বশেষ গত ১২ অক্টোবর পুরান ঢাকার চকবাজারে মনজুর খান প্লাজা মার্কেটের একটি দোকানে আগুন লাগে। প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে আগুনের ভয়াবহতা বাড়লে ইউনিটের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০টিতে। টানা প্রায় ১২ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। সরু গলির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে প্রবেশে বাধার মুখে পড়ে। পাশাপাশি দোকানে মজুত প্লাস্টিক ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ এবং পানির সংকট আগুন নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব ঘটায়।

এই ঘটনা পুরান ঢাকার অগ্নিঝুঁকি এবং তা মোকাবিলায় দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতা আবারও সামনে এনেছে। ফায়ার সার্ভিসের সুপারিশের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের গুদাম সরানো, ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পানির উৎস বাড়ানো এবং সরু গলির সমস্যা সমাধানের মতো বিষয় থাকলেও সেগুলোর দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন আটকে আছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ ভবন না কমায় দুর্ঘটনা বাড়ছে :

ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে পরিদর্শন করা ১০ হাজার ৫৩৩টি ভবনের মধ্যে ৬ হাজার ৫৯৫টি বা ৬২ দশমিক ৬২ শতাংশের অগ্নিনিরাপত্তা পরিস্থিতি সন্তোষজনক ছিল। বিপরীতে ৩ হাজার ৩১৬টি বা ৩১ দশমিক ৪৮ শতাংশ ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৬২২টি বা ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভবনকে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৪ সালে পরিদর্শন করা ভবনের ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ অগ্নিঝুঁকিতে ছিল। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ। প্রতিবছর ভবন পরিদর্শন, নোটিস, সতর্কতা ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পরও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের হার না কমায় কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠান, আবাসিক ভবন, পোশাক কারখানা, হাসপাতাল-ক্লিনিক, শপিং মল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট, কেমিক্যাল গুদাম ও ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব ভবনে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, মানুষ আটকে যাওয়া এবং উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। বিশেষ করে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ৬২২টি ভবন বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে।

ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের বড় অংশ বহু বছর আগে নির্মিত। ভবনের কাঠামো ও ব্যবহারের ধরন বিবেচনায় অনেক ক্ষেত্রে বর্তমান অগ্নিনিরাপত্তা মানদণ্ড পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এসব ভবন বছরের পর বছর ঝুঁকির তালিকায় থেকে যাচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন নির্মিত কিছু ভবনও প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই ব্যবহারে আসায় ঝুঁকি বাড়ছে। পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন ভবন ও হাসপাতালের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। 

ঝুঁকিতে ৮৮ শতাংশ কেমিক্যাল গুদাম :

সবচেয়ে বেশি অগ্নিঝুঁকির চিত্র পাওয়া গেছে কেমিক্যাল গুদামে। ২০২৫ সালে পরিদর্শন করা ৯১টি কেমিক্যাল গুদামের মধ্যে ৪২টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ৩৮টি অতি ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ, ৮০টি গুদামই কোনও না কোনও মাত্রায় অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে। হার হিসেবে তা প্রায় ৮৮ শতাংশ। পুরান ঢাকায় এই ঝুঁকি আরও প্রকট। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সেখানে প্রায় ২৫ হাজার রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব গুদামের প্রায় ১৫ হাজারের অবস্থান আবাসিক বাসাবাড়িতে।

পুরান ঢাকার আরমানিটোলা, লালবাগ, কোতোয়ালি, বংশাল ও চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় রাসায়নিক ও প্লাস্টিকের কাঁচামালে ঠাসা দোকান এবং গুদাম রয়েছে। কোথাও প্লাস্টিকের ড্রাম ও বস্তাভর্তি দাহ্য রাসায়নিক রাখা হয়েছে। এসব স্থাপনার ওপরের তলাতেই রয়েছে আবাসিক বাসাবাড়ি। দোকান ও গুদামের ওপর দিয়ে ঝুলে থাকা এলোমেলো বৈদ্যুতিক তারও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। গুদামগুলোতে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কিটোন, থিনার ও আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহলের মতো রাসায়নিক মজুত রাখা হয়। এসব দাহ্য পদার্থের উপস্থিতিতে আগুন দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে।

২০১০ সালের নিমতলী অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন এবং ২০১৯ সালের চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জন নিহত হন। এসব ঘটনার পর পুরান ঢাকা থেকে বিপজ্জনক রাসায়নিকের ব্যবসা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও রাসায়নিক গুদাম সরানোর উদ্যোগ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

বাস্তবায়ন হয় না ফায়ার সার্ভিসের সুপারিশ :

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেনটেনেন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, চকবাজারের আগুনের ভয়াবহতার মূল কারণ ছিল সেখানে মজুত প্লাস্টিক ও অন্যান্য দাহ্য পদার্থ। ধোঁয়ার কারণে শুরুতে ভেতরে প্রবেশ করা যায়নি। সরু গলির কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেও সমস্যা হয়েছে। এর সঙ্গে ছিল পানির তীব্র সংকট। সব মিলিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১২ ঘণ্টা সময় লাগে। পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করতে ফায়ার সার্ভিসের বিস্তারিত সুপারিশ ছিল। এসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম সরানো সম্ভব হতো। সিটি করপোরেশন, রাজউক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা ছাড়া পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন।

নোটিসের পরও সংশোধন হয় না ত্রুটি :

ফায়ার সার্ভিস জানায়, ভবন পরিদর্শনের সময় মালিকপক্ষকে ত্রুটি ও ঝুঁকির কারণ জানিয়ে তা সংশোধনের পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বে থাকা ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শকরা নোটিশ দেন। অনেক ক্ষেত্রে তাতেও কাজ হয় না। তখন সিটি করপোরেশন কিংবা জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। ২০২৫ সালে ১৯২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এতে ১৭৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ কোটি ৯৪ লাখ ৫২ হাজার ২২০ টাকা জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি আটটি মামলা করা হয়েছে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  অনিয়ম   অগ্নিকাণ্ড  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close