তুচ্ছ বিরোধ, জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার কিংবা পারিবারিক কলহের জেরে মানুষকে হত্যার ঘটনা ক্রমেই নৃশংস হয়ে উঠছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক হত্যাকাণ্ড জনমনে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
গতকাল শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) একদিনেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটেছে একাধিক হত্যার ঘটনা। সাতক্ষীরায় মাছ চুরি সন্দেহে এক ঘের ব্যবসায়ীকে গাছে বেঁধে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে এক ব্যক্তির হাতের রগ কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। কুমিল্লায় কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে এক ওয়ার্ড যুবদল নেতাকে। আর সুনামগঞ্জে পারিবারিক বিরোধের জেরে ৭০ বছর বয়সী মাকে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ছেলের বিরুদ্ধে। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার নেত্রকোনার কলমাকান্দায় একটি দোকানে বসে থাকা সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
এসব ঘটনায় অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে তৎপরতার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রাথমিকভাবে সামাজিক, পারিবারিক ও রাজনৈতিক বিরোধ এবং আধিপত্য বিস্তারের মতো বিষয়গুলো সামনে আসছে। তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরে আসে। অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস না করারও তাগিদ দিয়েছেন তারা।
সাতক্ষীরায় ঘের ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা
সাতক্ষীরার তালায় মাছ চুরি সন্দেহে ক্ষিতিশ মণ্ডল (৫২) নামের এক ঘের ব্যবসায়ীকে গাছে বেঁধে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বেলা ১২টার দিকে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন তার মৃত্যু হয়। ক্ষিতিশ তালা সদর ইউনিয়নের জেয়ালা গ্রামের মৃত মনিন্দ্র নাথ মণ্ডলের ছেলে। তিনি মাছের ঘের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার দিকে জেয়ালা উত্তর খোলা বিলের বিশ্বনাথ ঘোষের মাছের ঘেরে চুরির সন্দেহে ক্ষিতিশকে আটক করা হয়। পরে তাকে জেয়ালা শ্মশানঘাট এলাকায় নিয়ে একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বিশ্বনাথ ঘোষ, শিমুল ঘোষ, সমর ঘোষ, ইব্রাহিম খাঁ, হাবিবুর গাজী ও গফফার শেখসহ ১০ থেকে ১৫ জন জড়িত বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।
স্বজনদের অভিযোগ, রাতভর নির্যাতনের সময় ক্ষিতিশের হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয় এবং মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। এমনকি তার চোখ উপড়ে ফেলারও চেষ্টা করা হয়। পরে গতকাল সকাল ৮টার দিকে স্থানীয়দের সহায়তায় গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহসিন আলী জানান, মাছ চুরির অপবাদে ক্ষিতিশ মণ্ডলকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হত্যা
মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার চরকেওয়ার ইউনিয়নের টরকি মৃধাবাড়ি এলাকায় পূর্ববিরোধের জেরে মুন্না মৃধা (৫৫) নামের এক ব্যক্তিকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে হাতের রগ কেটে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল ভোরে পরিবারের সদস্যরা তাকে ২৫০ শয্যার মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মুন্না ওই এলাকার মরন আলী মৃধার ছেলে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মো. আতাউল করিম জানান, মুন্নাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। তার বাম হাতের রগ কাটা ছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে কাটা ও রক্তাক্ত জখমও ছিল। নিহতের স্ত্রী সালেহা বেগমের অভিযোগ, বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে তার স্বামী বাড়িতে থাকা অবস্থায় স্থানীয় ঝিংকু, সুমন ও বাবু মিজিসহ কয়েকজন দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকেন। তারা ৬০ হাজার টাকা দাবি করেন। বাধা দিলে তাকে ও তার মেয়েকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তার স্বামীকে অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
সালেহা বেগম জানান, কিছুক্ষণ পর তাকে পাশের একটি নির্জন জায়গায় যেতে বলা হলেও তিনি যাননি। পরে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আবার বাড়িতে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট করেন এবং হুমকি দেন। রাত ৩টার দিকে তাকে জানানো হয়, তার স্বামীকে বাড়ির বাইরে রেখে যাওয়া হয়েছে। পরে স্বজন ও স্থানীয়দের সহায়তায় মুন্নাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. কামরান হাসান জানান, মুন্নার সঙ্গে সুমন মিজির মাদকসংক্রান্ত বিরোধ ছিল। সুমন মাদক মামলায় কারাগারে থাকাকালে তার কিছু মাদকসংশ্লিষ্ট মালামাল মুন্না সরিয়ে ফেলেছেন বলে অভিযোগ ছিল। কারাগার থেকে বেরিয়ে সুমন ওই মালামালের মূল্য বাবদ টাকা দাবি করেন। এ বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে।
কুমিল্লায় যুবদল নেতাকে কুপিয়ে হত্যা
কুমিল্লা নগরীতে কাউছার নামের এক ওয়ার্ড যুবদল নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল দুপুরে নগরীর ছত্রখিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত কাউছার নগরীর ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা এবং স্থানীয় নেতা কবিরের ছোট ভাই।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার জানান, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। শুক্রবার ছত্রখিল এলাকায় অবস্থানকালে কাউছারের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এ সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ঘটনাস্থলে পড়ে থাকলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সুনামগঞ্জে মাকে কুপিয়ে হত্যা
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় পারিবারিক কলহের জেরে ৭০ বছর বয়সি মাকে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ছেলে নুরু আলমের বিরুদ্ধে। নিহত রেজিয়া খাতুন কাইয়ারগাঁও মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা ও মৃত হাসান উদ্দিনের স্ত্রী।
গতকাল ভোরে নিজ বসতঘরে ধারালো দা দিয়ে তার গলায় কোপ দেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় অভিযুক্ত নুরু আলমকে আটক করে।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রতন সেখ জানান, মা ও স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া এবং পারিবারিক বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত করা হচ্ছে।
জমি নিয়ে বিরোধে কাকিমাকে হত্যা
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে সুধারানী মণ্ডল (৬৫) নামের এক নারীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার ভাইপো রমেশ মণ্ডলের বিরুদ্ধে। বৃহস্পতিবার শ্যামনগর সদর ইউনিয়নের বাদঘাটা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত রমেশকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
সুধারানী বাদঘাটা গ্রামের মধুসূদন মণ্ডলের স্ত্রী। রমেশ একই গ্রামের শ্রীদাম মণ্ডলের ছেলে। নিহতের স্বামী মধুসূদনের সঙ্গে তার ছোট ভাই শ্রীদামের জমিজমা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ওই বিরোধের জের ধরে বৃহস্পতিবার সকালে রমেশ ধারালো দা দিয়ে বড় কাকিমা সুধারানীর গলায় কোপ দেন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
একই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডে বিরোধের ধরন আলাদা হলেও সহিংসতার নির্মমতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অপরাধের কারণ অনুসন্ধানের পাশাপাশি দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং বিচার নিশ্চিত করাই এখন মানুষের নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনা বড় চ্যালেঞ্জ।
কেকে/সাশ