যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পরও নিজের জনপ্রিয়তা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি নিজে প্রার্থী হলে রিপাবলিকানরা বিপুল ব্যবধানে জয়ী হতো। একই সঙ্গে দলের পরাজয়ের দায়ও অন্য নেতাদের ওপর চাপিয়েছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমি ব্যালটে ছিলাম না। থাকলে আমরা বিশাল ব্যবধানে জিততাম।’ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এমন মন্তব্যের মধ্য দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করলেও রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে দলের প্রার্থী ও নেতাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প বারবার রিপাবলিকান সমর্থকদের তাঁকে ব্যালটে থাকা প্রার্থী হিসেবে কল্পনা করে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে এবারের ফলাফলকে অনেক রিপাবলিকান নেতাই ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনামলের প্রতি জনগণের অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইরান সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। এর পাশাপাশি ট্রাম্পের জনসমর্থনও সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে ২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেনের কাছে পরাজয় মেনে না নেওয়ার ঘটনার পুনরাবৃত্তি এবার করবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ফলাফল গ্রহণে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করার এবং সমঝোতায় পৌঁছানোরও আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
যদিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের পরিচিত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) টুপি প্রকাশ করে তাতে ‘ভেটো’ শব্দটি যুক্ত করেন ট্রাম্প। এতে ডেমোক্র্যাটদের আইন প্রণয়নের উদ্যোগে তিনি বাধা দিতে পারেন—এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে নিজেকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে তুলে ধরার কথাও বলেছেন ট্রাম্প। এ ক্ষেত্রে তাঁর সমালোচনার মুখে পড়েছেন টেক্সাসের রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসার কাছে অ্যাবটের পরাজয়ের জন্য তাঁর অবস্থান পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন ট্রাম্প। অ্যাবটকে ‘রিপাবলিকান ইন নেম অনলি’ (রাইনো) বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হোয়াইট হাউসে হতাশা ও পাল্টা আক্রমণের ইঙ্গিত
নির্বাচনের ফল প্রকাশের সময় হোয়াইট হাউসে এক ধরনের আত্মরক্ষামূলক পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রেসিডেন্ট ও তাঁর মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যরা হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে বসে নির্বাচনের ফল পর্যবেক্ষণ করেন। এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, পরাজয়ের পরও হোয়াইট হাউসের মনোভাব ছিল চ্যালেঞ্জ গ্রহণের।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা রিপাবলিকান প্রার্থীদের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, অনেক প্রার্থীকে ট্রাম্প সমর্থন দিয়েছেন এবং তাদের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। কিন্তু প্রার্থীরা নিজেদের পক্ষে ভোটারদের যথেষ্ট আকৃষ্ট করতে পারেননি।
ওই কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, ইরান সংঘাতের সমাধান হলে দ্রুত জ্বালানির দাম কমে আসবে। তবে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়া মানুষ তখন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুতপ্ত হবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অবস্থান আরও কঠোর হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে হোয়াইট হাউস। এক কর্মকর্তার বক্তব্য, নির্বাচনের ফল যা-ই হোক, ‘র্যাডিক্যাল বামপন্থীদের’ মোকাবিলায় ট্রাম্পের সংকল্প আরও দৃঢ় হবে।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক ক্ষুব্ধ পোস্ট দেন ট্রাম্প। বিশেষ করে রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের নির্বাচনী সংবাদ পরিবেশন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। ফক্স নিউজের দর্শকসংখ্যা কমে যাওয়ার জন্যও নিজের প্রতি তাদের বিরূপ অবস্থানকে দায়ী করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছর রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসে আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন ও প্রশাসনিক নীতি বাস্তবায়নে রিপাবলিকান সরকারের সামনে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কেকে/সাশ