ডিসেম্বর মাসকে সামনে রেখে আটঘাট বেঁধে নেমেছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনগুলো। পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে পুঁজি করে এরই মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে, এ সহিংসতার পেছনে রয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ। দলটির অর্থায়নে তাদেরই বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের লোকজন শ্রমিকের বেশে নৈরাজ্য চালাচ্ছে।
সূত্র বলছে, শুধু পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনেই শেষ হবে না ফ্যাসিস্ট শক্তির অপতৎপরতা। বরং নভেম্বরজুড়েই নানা অপকর্ম চালিয়ে যাবে দলটি। বিশেষ করে সম্প্রতি উচ্ছেদ হওয়া হকার এবং অটোরিকশা চালকদের নিয়েও ষড়যন্ত্রের নীলনকশা আঁকছে পতিত আওয়ামী লীগ।
দলটির অভ্যন্তরীন কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ ও জনবল লাগাচ্ছে আওয়ামী লীগ। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রাজধানীতে জড়ো করা হয়েছে বহু নেতাকর্মীকে। বিদেশে পলাতক নেতারা এক্ষেত্রে দেদরা অর্থ ব্যয় করছে।
রাজধানীর কয়েকটি জোন— মোহাম্মদপুর, উত্তরার মতো এলাকাগুলোতে শ্রমিকদের ছদ্মবেশে নেতাকর্মীরা অবস্থান করছে। তারা এরই মধ্যে মিরপুরে উচ্ছেদ হওয়া হকরদের মধ্যে কাজ করা শুরু করেছে। সংগঠিত করার চেষ্টা করছে অটোরিকশা চালকদের। যাতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেলে তাদের মাঠে নামিয়ে দেওয়া যায়।
গোয়েন্দা সূত্র আরও নিশ্চিত করেছে, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন শেষ হওয়ার পর বৃহৎ আকারে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সহিংস কর্মসূচির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এ আন্দোলন জোরদার করতে নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা এরই মধ্যে নাশকতার ছক তৈরি করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে।
গত সোমবার হকার্স সমিতির পক্ষ থেকে ৭০০ থেকে ৮০০ হকার মানববন্ধন করেছে। পরে তারা গুলশান-২ এ উত্তর সিটি করপোরেশন অফিসে স্মারকলিপি জমা দেন। পাশাপাশি আওয়ামীপন্থি ব্যবসায়ীরাও সক্রিয় হয়ে সহিংসতাকারীদের পেছনে অর্থদাতা হিসেবে কাজ করছে। মদদ দিচ্ছেন খোদ গার্মেন্ট মালিকরাও।
গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা এরই মধ্যে ঢাকায় বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। তাদের টার্গেট নভেম্বরজুড়ে ব্যাপক নাশকতা-অস্থিরতা এবং পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে টার্গেট কিলিংয়েরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অনেক নেতাকর্মী এরইমধ্যে কলকাতা থেকে এসে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রেকি করেছেন। এ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টার্গেট করা হচ্ছে বলেও গোয়েন্দা সূত্র জানায়।
হকার-আওয়ামী লীগ একাকার
আন্দোলনে পোশাকশ্রমিকদের পাশাপাশি হকাররাও অংশ নিয়েছিলেন। তাদের অনেককে ভাড়া করে আনা হয়েছিল।
হকারদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর তাদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছে ডিবি ও পুলিশ। একইসঙ্গে এলাকায় ভাড়া থাকা পোশাকশ্রমিকদের নাম, ঠিকানা ও মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করা হচ্ছে।
ডিবির একটি সূত্র জানায়, ভাসমান চায়ের দোকানিদের কাছ থেকে হকারদের নামের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তারা কোথায় থাকেন, তা জানার চেষ্টা চলছে।
ডিবি সূত্র জানায়, আন্দোলনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিভিন্ন জেলা থেকে আনা হয়েছিল। তারা রাতে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে অবস্থান করেন। সকালে নেমে পড়েন মাঠে। অন্যদিকে স্থানীয় হকারদেরও সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যুক্ত করা হয়েছিল। ঘণ্টা হিসেবে তাদের ভাড়া করা হয়। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে তারা মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় হামলা ও ভাঙচুরে অংশ নেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, এসব ব্যক্তিকে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়। তাদের শর্ত দেওয়া হয়, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি হামলার ছবি তুলে নির্দিষ্ট গ্রুপে পাঠাতে হবে।
আন্দোলন পরিচালনা ও লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিক গ্রুপ খোলা হয়েছিল। এসব গ্রুপে ছবি পাঠালেই বিকাশের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হতো বলে ডিবির সূত্র জানিয়েছে।
ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, হকারদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য তারা পেয়েছেন। তবে বিষয়টি সামনে আনছেন না। কারণ, এ তথ্য প্রকাশিত হলে অন্য হকাররাও আন্দোলনে যোগ দিতে পারেন। সম্প্রতি মিরপুরে ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এতে ক্ষুব্ধ ছিলেন হকাররা। তাদের এ ক্ষোভকে কাজে লাগানো হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, আওয়ামী লীগপন্থি হকারদের একটি অংশ তাদের সংগঠিত করেছিল। এ হকারদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতে দোকান বসানোর পাশাপাশি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। উচ্ছেদের পর তারা বেকার হয়ে পড়েন। এ সুযোগ কাজে লাগায় ষড়যন্ত্রকারী চক্র। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাও এতে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
কেকে/সাশ