দেশের অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে সেবাপ্রার্থীদের। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, দালালদের দৌরাত্ম্যসহ চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম রয়েছে এ চিকিৎসালয়টিতে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আকস্মিক অভিযান চালায়।
দুদক চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে ঢামেক হাসপাতালে এ আকস্মিক অভিযান ও পরিদর্শন পরিচালনা করা হয়। এ সময় বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম দেখতে পান দুদক চেয়ারম্যান। অভিযানে হাসপাতালের জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি, পোশাক বিধিমালা না মানা এবং দালালদের দৌরাত্ম্যসহ চরম অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম দেখতে পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
দুদকের ঝটিকা অভিযানে জরুরি বিভাগ এবং নিউরোসার্জারি বিভাগসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কক্ষের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের নির্ধারিত সিটে পাওয়া যায়নি। চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির কারণে রোগীরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন। অনুপস্থিত চিকিৎসকদের মধ্যে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. তানভীর ও নিউরোসার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের নাম বিশেষভাবে উঠে আসে।
দুদক চেয়ারম্যান ঘটনাস্থল থেকেই ঢামেক হাসপাতালের পরিচালককে নির্দেশ দেন যেন অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ‘কারণ দর্শানোর নোটিস’ জারি করা হয়। পাশাপাশি দুদকও তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে বলে হুঁশিয়ারি দেন।
জরুরি বিভাগে কর্মরত চিকিৎসকদের কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বিধিমালা বা আইডি কার্ড ঝুলিয়ে ডিউটি করতে দেখা যায়নি। বিষয়টি নিয়ে দুদক চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান বলেন, “জরুরি বিভাগে কে চিকিৎসক, কে নার্স আর কে দালাল— সেটি চেনার কোনো উপায় নেই।” সবার সঠিক ড্রেস কোড ও পরিচয়পত্র নিশ্চিত করার জন্য তিনি তাগিদ দেন।
পরিদর্শনকালে রোগী এবং তাদের স্বজনরা দুদক টিমের কাছে অভিযোগ করেন, হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী ও ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে না এবং বাইরে থেকে কেনার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়া প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালের দালালদের সিন্ডিকেট সরকারি এই হাসপাতালে ব্যাপকভাবে সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া এ চিকিৎসালয়ে সিট পেতেও টাকা দিতে হয়।
এ সময় চাঁদপুরের মতলব নালুয়া আশ্রম থেকে আসা এক রোগীর স্বজন দুদক টিমকে বলেন, ‘এখানে ভালো চিকিৎসার জন্য অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে এক দালাল আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যায়। কিন্তু এখন তার কোনো খবর পাচ্ছি না। খুঁজেও পাচ্ছি না। আমার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে গেছে। আমার স্বামী একজন সামান্য রিকশাচালক।’
হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে দুদক চেয়ারম্যান এ কে এম. আসাদুজ্জামান বলেন, এ হাসপাতালে রোগীরা অনেক সুবিধাই পাচ্ছে না। এছাড়া একদম জরাজীর্ণ পরিবেশ। হাসপাতালের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে রোগীদের প্রাইভেট ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেওয়ার যে সিন্ডিকেট, তাদের বিরুদ্ধে দুদক শক্ত ব্যবস্থা নেবে।
হাসপাতালের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের বিষয়ে ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন জানান, তিনি সম্প্রতি এই হাসপাতালে যোগ দিয়েছেন এবং সেবার মানউন্নয়নে কাজ শুরু করেছেন। দুদকের চিহ্নিত করা এই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে এবং হাসপাতালকে দালালমুক্ত করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
তিনি বলেন, ‘আগে হাসপাতালে ঠিক মতো ওষুধ পাওয়া যেত না। এখন বেশিরভাগ ওষুধ আমরা পাচ্ছি এবং অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছে আগের থেকে। তবে পুরোপুরি উন্নতি করতে কিছুটা সময় লাগবে।’
এ বিষয়ে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ডাক্তার ও শিক্ষকদের অনিয়ম ধরা সহজ। কিন্তু প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতি ও অনিয়মে অভ্যস্ত তাদের বিষয়ে তো নজরদারি কম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগ দেশের মধ্যে সবচেয়ে দক্ষ ও কর্মচঞ্চল একটি স্থান। সেখানে যদি অনিয়ম থাকে সেটা নিরসনে অবশ্যই চিকিৎসালয়টির পরিচালককে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু, এটাও মনে রাখতে হবে যে ঢামেকে ধারণক্ষমতার তিনগুণ রোগীকে সামাল দেওয়া হয়। এখানে চিকিৎসকদের তুলনায় দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য দূর করা জরুরি।’
কেকে/সাশ