দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন, সড়ক অবরোধ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একের পর এক পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকরা কাজে যোগ না দিয়ে কারখানা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, আবার কোথাও উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন মালিকপক্ষ। সব মিলিয়ে গত কয়েকদিনে প্রায় ৭০০ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।
এতে দেশের পোশক শিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, উৎপাদন বন্ধ থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। এতে রপ্তানি চালান বিলম্বিত হওয়া, ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়া, নতুন অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবহন, প্যাকেজিং, বস্ত্র, সুতা, আনুষঙ্গিক পণ্য ও অন্যান্য সহযোগী খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিজিএমইএও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় উৎপাদন ব্যাহত হলে রপ্তানি চালান ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে শ্রমিক আন্দোলনের নেপথ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে বলে একাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এ ছাড়া ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, পোশাকশ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতার অভিযোগে নিষিদ্ধ সংগঠনের ৩৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংযোগ থাকতে পারে। সরকার এমনটাই মনে করে। আন্দোলনে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জড়িত থাকা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের দেওয়া বক্তব্যের কথা বলে জাহেদ উর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে বলেছেন, তার কাছে নিশ্চিত তথ্য আছে, সুতরাং সেটার সঙ্গে তাদের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ) সংযোগ থাকতেই পারে।’
পোশাকশ্রমিকের ‘ছদ্মবেশে’ নাশকতার অভিযোগে গত ২৪ ঘণ্টায় নিষিদ্ধ সংগঠনের ৩৩ সদস্যকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ডিএমপি। গতকাল মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের এক খুদে বার্তায় এই তথ্য জানানো হয়।
এদিকে গতকাল টানা চতুর্থ দিনের মতো আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকরা। এদিন কয়েকশ কারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের ৩০৬টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
কাজে যোগ না দেওয়া এবং নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে গত সোমবার অন্তত ৬৯০টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ১৭ লাখের বেশি।
গতকাল শ্রমিক বিক্ষোভের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে।
পোশাকশ্রমিকরা গাজীপুর মহানগরের নাওজোড় এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। এ সময় সড়কে বাঁশ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। কোনাবাড়ী, মৌচাক ও তেলিচালা এলাকাতেও শ্রমিকদের বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়।
শ্রমিক আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর মিরপুর শিল্পাঞ্চলেও। সকাল ১০টার দিকে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। সংঘর্ষের কারণে পল্লবী-মিরপুর-১০ সড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। পরে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। এ ঘটনায় অন্তত চারজনকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। সংঘর্ষের কারণে মিরপুর-১১ মেট্রোরেল স্টেশনেও সাময়িকভাবে ট্রেন থামানো বন্ধ রাখা হয়।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় ৩৮২টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। সাভার-আশুলিয়া ও জিরাবো এলাকায় ২২৩টি এবং মিরপুরে ৬৫টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত প্রায় ২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল।
কেকে/সাশ