দেশে বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে এলপিজির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ না থাকা এবং নতুন সংযোগ সীমিত থাকায় অনেক পরিবার সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল।
পাইপলাইনের গ্যাসের সংযোগ থাকলেও বর্তমানে দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ একেবারেই থাকে না। বাধ্য হয়ে তাদের অনেককেই সিলিন্ডার ব্যবহার করতে হয়। এর ফলে এলপিজির দাম বাড়লে সরাসরি বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েন সাধারণ ভোক্তারা। আবার দাম বৃদ্ধির পরও বাজারে নৈরাজ্য থামে না। নির্ধারিত দামের চেয়ে আরও ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি দিয়ে একটি সিলিন্ডার কিনতে হয়।
এই অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির ফলে খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চরম হিমশিম খাচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক দর ও প্রতিবেশী দেশগুলোর বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এলপিজির দাম পুনর্বিবেচনা এবং বাজার মনিটরিং জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।
৯ মাসে ৭১৯ টাকা বেড়েছে ১২ কেজি এলপিজির দাম
সাধারণ ভোক্তাদের ব্যাপক চাহিদার কারণে দেশে গ্যাস ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা সিন্ডিকেট করে যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছেন। এতে করে এলপিজির দাম বেড়েই চলেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৭১৯ টাকা। চলতি বছরের মার্চে ১ হাজার ৩৪১ টাকা দামের একটি সিলিন্ডার চলতি নভেম্বর মাসে বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৬০ টাকা।
দামের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অক্টোবরে তা ২৫২ টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৩৭ টাকায়। নভেম্বর মাসে আরও ২২৩ টাকা বাড়িয়ে সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয় ২ হাজার ৬০ টাকা। এর আগে মার্চে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। সে হিসাবে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দাম বেড়েছে ২৪৪ টাকা।
৯ মাসের ব্যবধানে ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭১৯ টাকা বা প্রায় ৫৪ শতাংশ বেড়েছে। এতে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর ব্যয় আরও বেড়েছে। পরপর কয়েক মাসে বড় অঙ্কের মূল্যবৃদ্ধিতে এলপিজি এখন সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যেসব পরিবার রান্নার কাজে সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, তাদের মাসিক সংসার খরচে এর প্রভাব পড়ছে।
দামের পার্থক্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তাদের অভিযোগ
এলপিজির মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের দাম, আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার এবং পরিবহনসহ সংশ্লিষ্ট খরচ বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিইআরসি প্রতি মাসে এসব বিষয় পর্যালোচনা করে ভোক্তাপর্যায়ে এলপিজির দাম সমন্বয় করে। তবে কমিশনের নির্ধারিত দামের সঙ্গে বাজারে বিক্রি হওয়া সিলিন্ডারের দামের পার্থক্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তাদের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ ওঠে। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর বাজারে এলপিজি বিক্রি কমিশনের নির্ধারিত মূল্যে হচ্ছে কি না, তা নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ সরকার নির্ধারিত দাম বাড়তি হলেও বাজারে তার প্রভাব থাকে না। নির্ধারিত দাম থেকে আরও ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি দিয়ে একটা ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হয়। এই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা চলছে বছরের পর বছর।
ভোক্তাদের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির কথা বলে দেশীয় বাজারে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়। অথচ, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্যের দিক থেকে শীর্ষ স্থানটি বাংলাদেশের দখলে। এতে করে জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়ের যাঁতাকলে পড়ে দেশের সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্তের বাজেটে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়।
বিভিন্ন দেশের বর্তমান মূল্যচিত্র নিম্নরূপ
বাংলাদেশ : দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ দামে এলপিজি কিনতে হচ্ছে বাংলাদেশের ভোক্তাদের। বর্তমানে এখানে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য পৌঁছাল রেকর্ড ২০৬০ টাকায়।
পাকিস্তান : তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাকিস্তানে এই সমপরিমাণ সিলিন্ডারের দাম ১৪৮৮ টাকা।
শ্রীলঙ্কা : দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় ১২ কেজির প্রতিটি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম রাখা হচ্ছে ১৩৯২ টাকা।
নেপাল : দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার মতো হিমালয় কন্যা নেপালেও ১২ কেজি এলপিজির প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম রাখা হচ্ছে সমান ১৩৯২ টাকা।
ভারত (কলকাতা) : পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতা বাজারে এলপিজির দাম সবচেয়ে কম, যেখানে ১২ কেজি সমমানের সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০৮৮ টাকায়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ক্ষোভ প্রকাশ
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দেওয়া হলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে মূল্যের এই আকাশ-পাতাল ব্যবধান দেশের বাজারে দুর্বল তদারকি ও আমদানিনির্ভর ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুর চিত্রটিই স্পষ্ট করে তুলছে। বাজারের এমন চরম বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এম শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও তার সুফল দেশের ভোক্তারা পাচ্ছেন না, আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সঙ্গে সঙ্গে বিইআরসিও দেশে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া সরকারিভাবে এলপিজির যে দাম নির্ধারণ করা হয়, তা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে; খুচরা বাজারে সেই নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না।
তিনি আরও বলনে, বিইআরসি ও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের তদারকির অভাব এবং আমদানিকারকদের সিন্ডিকেটের কারণেই আজ সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে।
কেকে/সাশ