এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষ বাঁচানোর লক্ষ্যে ১ মাসের মধ্যে বিশেষ পুনঃপরীক্ষা (সম্পূরক পরীক্ষা) নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ৩১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদি আমিন যৌথভাবে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান।
গত শনিবার এবারের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। এতে অকৃতকার্য হন প্রায় ৬ লাখ শিক্ষার্থী। পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ; যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ কারণে প্রথমবারের মতো সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে ফেল করা ৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে। আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এ পরীক্ষা নিয়ে একই মাসের শেষে ফল প্রকাশের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। যাতে এর মাধ্যমে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের চলতি শিক্ষাবর্ষে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ দেওয়া যায়।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটসহ মেডিকেল ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভর্তি পরীক্ষা পেছানোর বিষয়ে মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এতে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিক আলোচনা মোতাবেক যদি ভর্তি পরীক্ষার তারিখ পেছানো না হয়, তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বড় বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের চলতি সেশনের ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারবেন না নতুন করে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা। তবে সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি (জিএসটি) গুচ্ছভুক্ত ২০-এর অধিক বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ থাকবে তাদের জন্য।
তথ্যমতে, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি ইতোমধ্যে ঘোষণা করা হয়েছে। সূচি অনুযায়ী, আগামী ৪ ডিসেম্বর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে ৫ ডিসেম্বর। এরপর ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ৫ ডিসেম্বর আইবিএ ইউনিটের পরীক্ষার মধ্য দিয়ে শুরু হবে। এরপর ১২ ডিসেম্বর ‘এ’ ইউনিট, ১৯ ডিসেম্বর ‘বি’ ইউনিট, ২২ ডিসেম্বর চারুকলা ইউনিট এবং ২৬ ডিসেম্বর ‘সি’ ইউনিটের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদের সাপ্লিমেন্টারি (বিশেষ) পরীক্ষায় বসার সুযোগ দিচ্ছে সরকার। আগামী ১ ডিসেম্বর এ পরীক্ষা শুরু হবে। একই মাসের মধ্যেই ফল প্রকাশ করবে বোর্ডগুলো। এতে উত্তীর্ণদেরও ইতোমধ্যে তারিখ ঘোষণা করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আবেদনের সুযোগ দেওয়ার দাবি উঠেছে। তবে এমন দাবি মেনে ভর্তি পরীক্ষা পেছানোর সুযোগ নেই বলে জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হবে ১৭ ও ১৮ ডিসেম্বর। একই মাসের ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা হবে ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শুরু হবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) ভর্তি পরীক্ষা হবে ১ জানুয়ারি থেকে। ২ জানুয়ারি কৃষি গুচ্ছের নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শুরু হবে ৮ জানুয়ারি। ৯ জানুয়ারি ‘সি’ ইউনিট এবং ১৬ জানুয়ারি ‘এ’ ইউনিটের পরীক্ষা নেওয়া হবে। একই দিনে, অর্থাৎ ৮ জানুয়ারি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ ১৪ জানুয়ারি এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভর্তি পরীক্ষা ১৬ জানুয়ারি নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা আগামী ১৭ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে পারে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা হবে ২৬ ও ২৭ জানুয়ারি। বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা শুরু হবে ২৯ জানুয়ারি এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা হবে ৫ থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি।
এ ছাড়া সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছের ভর্তি পরীক্ষা মার্চে অনুষ্ঠিত হবে। ১৯ মার্চ ‘বি’ ইউনিট, ২০ মার্চ ‘সি’ ও ‘ডি’ ইউনিট এবং ২৭ মার্চ ‘এ’ ইউনিটের পরীক্ষা নেওয়ার সূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশের সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা আগামী ৪ ডিসেম্বর আয়োজনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। তবে এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময়ের ওপর নির্ভর করছে নির্ধারিত দিনে পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়টি।
তবে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা এসব ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনার তথ্য দেওয়া হয়নি। সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার ফল প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ ৩১ ডিসেম্বর হওয়ায় ডিসেম্বরের ভর্তি পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সময়গত জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে ভর্তি পরীক্ষার যোগ্যতা ও এইচএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত আলাদা হওয়ায় এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও ভর্তি কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা আছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি সংগ্রহ করে শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সচিবদের বিষয়টি অবহিত করেছি। সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা যেন চলতি শিক্ষাবর্ষের ভর্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে, সে বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবার আগে ভর্তি পরীক্ষা নিতে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে হবে, এটি স্বাভাবিক। তবে যেসব শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিল, তারা পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফলাফল করলে তাদেরও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি ও স্বার্থের জায়গা থেকে বিবেচনা করে আসন্ন সিন্ডিকেট সভায় আলোচনার জন্য তোলা হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিবাচক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে কি না, তা পর্যালোচনা করা হবে।
এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, এইচএসসিতে পুনঃপরীক্ষায় অংশ নেওয়াদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ রাখা উচিত। এ বিষয়টি একটি গাইড লাইন বা নীতিমালা থাকা দরকার। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনো পুনঃপরীক্ষায় অংশ নেওয়াদের বিষয়টি আমলে নেয়নি।
কিন্তু, এটাও মনে রাখতে হবে যে, পুনঃপরীক্ষার সুযোগ রাখা হয়েছে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। জীবনে ভালো কিছু করার জন্য কর্মমুখী শিক্ষা দরকার। এ বিষয়টি অবারিত হয়েছে পুনঃপরীক্ষার মাধ্যমে।
কেকে/সাশ